
বিদ্যুৎ বিল কমানোর পরামর্শ অনেক শোনা যায়, কিন্তু একটি প্রশ্নের উত্তর কমই মেলে: আমার ক্ষেত্রে এক ইউনিট বাঁচালে ঠিক কত টাকা বাঁচবে? উত্তর নির্ভর করে আপনি কোন ধাপে আছেন তার ওপর। ধাপ যত ওপরে, প্রতিটি ইউনিটের দাম তত বেশি। বিদ্যুৎ বিল ক্যালকুলেটরে আজকের ইউনিট আর কমানোর লক্ষ্য বসিয়ে পাশাপাশি দেখে নেওয়া যায়। এই লেখায় সেই হিসাবটা নিজে করার পদ্ধতি দেওয়া হলো।
এক বাড়তি ইউনিটের আসল খরচ

আপনার বিল যে ধাপে শেষ হয়, বাড়তি বা কমানো ইউনিট সেই ধাপের হারে চলে। ভ্যাট ৫% যোগ হয় বলে ধাপের হারকে ১.০৫ দিয়ে গুণ করলে ভ্যাটসহ খরচ পাওয়া যায়:
| যে ধাপে শেষ হয় | ধাপের হার | ভ্যাটসহ প্রতি ইউনিট (প্রায়) |
|---|---|---|
| ০–৭৫ | ৫.২৬ | ৫.৫২ |
| ৭৬–২০০ | ৮.৫০ | ৮.৯৩ |
| ২০১–৩০০ | ৯.১০ | ৯.৫৬ |
| ৩০১–৪০০ | ৯.৬২ | ১০.১০ |
| ৪০১–৬০০ | ১৫.০১ | ১৫.৭৬ |
| ৬০০-এর ওপরে | ১৭.৩৫ | ১৮.২২ |
দেখুন, ৪০০ ইউনিটের পরের প্রতিটি ইউনিট প্রায় ১৫.৭৬ টাকা, যা ৩০১–৪০০ ধাপের ১০.১০ টাকার দেড় গুণের বেশি। কিন্তু এই বাড়তি হার শুধু ৪০০-এর পরের ইউনিটের ওপর খাটে, আগের ইউনিটের দাম বদলায় না। (পুরো ধাপব্যবস্থা বোঝার জন্য দেখুন বিদ্যুৎ বিল কীভাবে হিসাব হয়।)
৪০০, ৪২০ ও ৪৫০ ইউনিটের তুলনা

১ কিলোওয়াট লোড ও মিটার ভাড়া ০ ধরে:
| ইউনিট | ইউনিটের দাম | ভ্যাট ৫% | মোট বিল |
|---|---|---|---|
| ৪০০ | ৩,৩২৯.০০ | ১৬৮.৫৫ | ৩,৫৩৯.৫৫ |
| ৪২০ | ৩,৬২৯.২০ | ১৮৩.৫৬ | ৩,৮৫৪.৭৬ |
| ৪৫০ | ৪,০৭৯.৫০ | ২০৬.০৮ | ৪,৩২৭.৫৮ |
- ৪৫০ থেকে ৪২০-তে নামালে ৩০ ইউনিট কমে। ৩০ × ১৫.০১ × ১.০৫ ≈ ৪৭২.৮২ টাকা বাঁচে।
- ৪৫০ থেকে ৪০০-তে নামালে ৫০ ইউনিট কমে। ৫০ × ১৫.০১ × ১.০৫ ≈ ৭৮৮.০৩ টাকা বাঁচে।
- ৪০০ থেকে ৩৫০-এ নামালে ৫০ ইউনিট কমে, কিন্তু সাশ্রয় ৫০ × ৯.৬২ × ১.০৫ ≈ ৫০৫.০৫ টাকা, অর্থাৎ ওপরের ধাপের তুলনায় অনেক কম।
যন্ত্র থেকে মাসের ইউনিট বের করার সূত্র
কত ইউনিট বাঁচাতে পারেন, সেটি জানতে নিজের যন্ত্রের ব্যবহার মাপতে হবে। সূত্র: ওয়াট × দিনে চলার ঘণ্টা × ৩০ ÷ ১,০০০ = মাসের ইউনিট। যন্ত্রের ওয়াট তার গায়ের লেবেলে বা বইয়ে লেখা থাকে। ধরুন একটি যন্ত্র ১,০০০ ওয়াট টানে (নিজের যন্ত্রের লেবেল দেখে সংখ্যাটি বদলে নিন) এবং প্রতিদিন এক ঘণ্টা কম চালান:
- মাসে কমে ১,০০০ × ১ × ৩০ ÷ ১,০০০ = ৩০ ইউনিট।
- বিল ২০১–৩০০ ধাপে শেষ হলে সাশ্রয় প্রায় ৩০ × ৯.৫৬ = ২৮৬.৬৫ টাকা (৯.১০ × ১.০৫ থেকে হিসাব করলে)।
- বিল ৪০১–৬০০ ধাপে শেষ হলে সাশ্রয় প্রায় ৪৭২.৮২ টাকা।
একই অভ্যাস বদলালেও ধাপভেদে সাশ্রয়ে বড় তফাত হয়: ২৮৬.৬৫ বনাম ৪৭২.৮২ টাকা। তাই আগে বের করুন আপনার বিল কোন ধাপে শেষ হচ্ছে।
উল্লেখ্য, এই সংখ্যাগুলো উদাহরণ। আপনার ঘরের যন্ত্র আসলে কত ওয়াট টানে ও কত ঘণ্টা চলে, তা আপনার নিজের মাপ ছাড়া জানা যায় না।
যা কমানো যায় না
ব্যবহার কমালে শুধু ইউনিটের দাম আর তার ওপরের ভ্যাট কমে। ডিমান্ড চার্জ আর মিটার ভাড়া স্থির থাকে, কারণ এগুলো অনুমোদিত লোড ও মিটারের ওপর নির্ভর করে। এই দুই লাইনের হিসাব দেখুন ডিমান্ড চার্জ, লোড ও মিটার ভাড়া লেখায়।
আর যদি ৫০ ইউনিটের কাছাকাছি থাকেন, তাহলে সীমার ওপারে যাওয়া-না-যাওয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। সেই বিশেষ নিয়ম আছে ৫০ ইউনিট বনাম ৫১ ইউনিট লেখায়।
টুলে নিজের পরিকল্পনা পরীক্ষা করুন
- এ মাসের ইউনিট বসিয়ে বিল দেখুন। ধাপের টেবিলে শেষ ধাপটি চিনে নিন।
- লক্ষ্য ইউনিট বসান। যেমন ৩০ ইউনিট কম।
- দুটি বিলের পার্থক্যই আপনার সাশ্রয়। এটি ওপরের সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
- বিলে ছাপা অঙ্কের সঙ্গে আগের মাসের হিসাব মেলাতে নিজের বিল টুলের সঙ্গে মেলানোর উপায় পড়ুন।
সীমার ঠিক ওপরে থাকলে
ধাপের সীমার সামান্য ওপরে থাকলে অল্প কমিয়েই নিচের ধাপে নামা যায়। ১ কিলোওয়াট লোড ও মিটার ভাড়া ০ ধরে ৪০৫ ইউনিটের বিল ৩,৬১৮.৩৫ টাকা, আর ৪০০ ইউনিটের বিল ৩,৫৩৯.৫৫ টাকা। মাত্র ৫ ইউনিট কমালে বিল কমে ৭৮.৮০ টাকা, অর্থাৎ ৫ × ১৫.৭৬। মাসের শেষ দিকে মিটারের রিডিং দেখে নিলে আপনি কোন পাশে আছেন বোঝা যায়।
বছরের হিসাবে সাশ্রয়
ছোট অভ্যাসের সাশ্রয় বছরে জমে। প্রতি মাসে ৩০ ইউনিট কম খরচ করলে বছরে সাশ্রয়:
- ২০১–৩০০ ধাপে বিল শেষ হলে: ২৮৬.৬৫ × ১২ = ৩,৪৩৯.৮০ টাকা।
- ৪০১–৬০০ ধাপে বিল শেষ হলে: প্রায় ৪৭২.৮২ × ১২ = ৫,৬৭৩.৭৮ টাকা।
অর্থাৎ একই ৩০ ইউনিট কমানোর মূল্য ধাপভেদে প্রায় দুই হাজার টাকা তফাত হয়ে দাঁড়ায়।
নিজের ঘরের ইউনিট কোথায় যাচ্ছে বুঝবেন কীভাবে
- বড় যন্ত্রগুলোর (এসি, ফ্রিজ, পানির পাম্প, ইস্ত্রি, ফ্যান, বাতি) ওয়াট লেবেল থেকে লিখে নিন।
- প্রতিটির দিনে চলার গড় ঘণ্টা আন্দাজ করুন।
- সূত্র দিয়ে মাসের ইউনিট বের করুন: ওয়াট × ঘণ্টা × ৩০ ÷ ১,০০০।
- সবগুলো যোগ করে বিলের মোট ইউনিটের সঙ্গে মেলান। কিছু ইউনিট ব্যাখ্যা না হলে ভুলে যাওয়া যন্ত্র বা বেশি চলা যন্ত্র খুঁজুন।
- যেটি সবচেয়ে বেশি ইউনিট খায়, সেটির ব্যবহার কমানোর ফল টুলে বসিয়ে দেখুন।
ফ্রিজ ও রাউটারের মতো যন্ত্র সারাদিন চলে, কিন্তু সবসময় পুরো ওয়াটে নয়; তাই এসব যন্ত্রের মাসিক ইউনিট আন্দাজ মাত্র।
দিনের লক্ষ্য ঠিক করুন
মাসের লক্ষ্যকে দিনে ভাগ করলে মেনে চলা সহজ হয়। যেমন ৪০০ ইউনিটের লক্ষ্যে দিনে গড় ৪০০ ÷ ৩০ ≈ ১৩.৩ ইউনিট। সপ্তাহে একবার মিটারের রিডিং লিখে দেখুন গড় লক্ষ্যের ভেতরে আছে কি না। লক্ষ্য ছাড়াতে থাকলে মাসের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা না করে আগেই কোন যন্ত্র বেশি টানছে দেখে নিন।
সীমাবদ্ধতা ও হালনাগাদ: এই লেখার সব হিসাব জুন ২০২৬ বিল-মাস থেকে কার্যকর আবাসিক হার, ১ কিলোওয়াট লোড ও মিটার ভাড়া ০ ধরে। হার সংবাদ প্রতিবেদনের সঙ্গে মিলিয়ে ধরা, বিইআরসির মূল প্রজ্ঞাপন সরাসরি মেলানো হয়নি। হার বদলালে সংখ্যা বদলাবে। বিদ্যুৎ বাঁচানোর জন্য স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা বা পড়াশোনার মতো দরকারি কাজ আটকাবেন না; এটি শুধু হিসাব বোঝার সহায়তা। হালনাগাদ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬।
সাধারণ প্রশ্ন
এক ইউনিট কমালে কত টাকা কমে?
আপনি যে ধাপে আছেন তার হারের ১.০৫ গুণ, যেমন ৪০১–৬০০ ধাপে প্রায় ১৫.৭৬ টাকা, ৭৬–২০০ ধাপে প্রায় ৮.৯৩ টাকা।
কোন ধাপে কমালে সবচেয়ে বেশি লাভ?
সবচেয়ে ওপরের ধাপে, যেখানে আপনার বিল শেষ হচ্ছে। সেখানকার ইউনিটের হার সবচেয়ে বেশি।
ডিমান্ড চার্জ কি ব্যবহার কমালে কমে?
না। এটি অনুমোদিত লোডের ওপর নির্ভর করে, ব্যবহারের ওপর নয়।
