
মাস শেষে বিদ্যুৎ বিল হাতে এলে অনেকেই ভাবেন, এই সংখ্যাটা এল কোথা থেকে। ইউনিট কম খরচ করেছি মনে হলেও বিল বেশি আসে, আবার পাশের ফ্ল্যাটের সঙ্গে তুলনা করলে মেলে না। কারণ বিল শুধু “ইউনিট × এক হার” নয়। এতে ধাপ আছে, আলাদা চার্জ আছে, আর সবকিছুর ওপর ভ্যাট বসে। বিদ্যুৎ বিল ক্যালকুলেটরে মাসের ইউনিট বসালে পুরো হিসাব দেখা যায়। এই লেখায় একই হিসাব নিজে হাতে করার নিয়মটি দেখানো হয়েছে, যাতে টুলের ফল আপনি নিজেই যাচাই করতে পারেন।
এখানে আবাসিক (এলটি-এ) গ্রাহকের পোস্টপেইড মিটারের বিল ধরা হয়েছে। বাণিজ্যিক, শিল্প বা সেচের হার আলাদা।
বিলের চারটি অংশ

- ইউনিটের দাম: মাসে যত ইউনিট (কিলোওয়াট-ঘণ্টা) পুড়িয়েছেন, তার ধাপভিত্তিক দাম।
- ডিমান্ড চার্জ: আপনার অনুমোদিত লোড (কিলোওয়াট) গুণ প্রতি কিলোওয়াটের নির্ধারিত চার্জ। এই কোডে ধরা হয়েছে প্রতি কিলোওয়াটে ৪২ টাকা।
- মিটার ভাড়া: বিলে যে অঙ্ক লেখা থাকে, সেটাই। কোনো একক সরকারি হার ধরে নেওয়া হয় না।
- ভ্যাট: উপরের তিনটির যোগফলের ওপর ৫%।
সূত্র: মোট বিল = (ইউনিটের দাম + ডিমান্ড চার্জ + মিটার ভাড়া) × ১.০৫।
প্রথম অংশ: ইউনিটের দাম কীভাবে ধাপে ধাপে হয়
আবাসিক গ্রাহকের হার ছয়টি ধাপে ভাগ করা। ব্যবহার যত বাড়ে, বাড়তি ইউনিটের হার তত চড়ে। জুন ২০২৬ বিল-মাস থেকে কার্যকর বিইআরসির মূল্যহার অনুযায়ী ধাপগুলো এমন:
| ধাপ (ইউনিট) | প্রতি ইউনিট (টাকা) |
|---|---|
| লাইফলাইন: ০–৫০ (শুধু যাঁরা ৫০ বা কম খরচ করেন) | ৪.৬৩ |
| প্রথম ধাপ: ০–৭৫ | ৫.২৬ |
| দ্বিতীয় ধাপ: ৭৬–২০০ | ৮.৫০ |
| তৃতীয় ধাপ: ২০১–৩০০ | ৯.১০ |
| চতুর্থ ধাপ: ৩০১–৪০০ | ৯.৬২ |
| পঞ্চম ধাপ: ৪০১–৬০০ | ১৫.০১ |
| ষষ্ঠ ধাপ: ৬০০-এর ওপরে | ১৭.৩৫ |
দুটি নিয়ম মাথায় রাখুন। প্রথমত, ৫০ বা তার কম ইউনিট খরচ করলে সবগুলো ইউনিটই ৪.৬৩ হারে গোনা হয়। দ্বিতীয়ত, ৫১ ইউনিট বা তার বেশি হলে লাইফলাইন হার আর খাটে না; তখন প্রথম ধাপ (০–৭৫) থেকে ধাপে ধাপে হিসাব শুরু হয়। এই সীমার প্রভাব আলাদা করে বোঝানো আছে ৫০ ইউনিট বনাম ৫১ ইউনিট গাইডে।
উদাহরণ: ২৫০ ইউনিট খরচ হলে
ধরুন মাসে ২৫০ ইউনিট গেছে, অনুমোদিত লোড ১ কিলোওয়াট, মিটার ভাড়া বিলে লেখা নেই (০ ধরা হলো)। ইউনিটগুলো তিন ধাপে ভাগ হয়:

- প্রথম ৭৫ ইউনিট × ৫.২৬ = ৩৯৪.৫০
- পরের ১২৫ ইউনিট (৭৬ থেকে ২০০) × ৮.৫০ = ১,০৬২.৫০
- বাকি ৫০ ইউনিট (২০১ থেকে ২৫০) × ৯.১০ = ৪৫৫.০০
যোগ করলে ইউনিটের দাম হয় ১,৯১২.০০ টাকা। ভুল করে অনেকে ২৫০ ইউনিটকে সরাসরি ৯.১০ দিয়ে গুণ করে ফেলেন, যা ২,২৭৫ টাকা হয়। সেটা ভুল, কারণ তৃতীয় ধাপের হার শুধু ২০০ ইউনিটের পরের অংশে খাটে।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় অংশ: ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া
ডিমান্ড চার্জ ইউনিটের ওপর নির্ভর করে না। লোড ১ কিলোওয়াট হলে ৪২ টাকা, ২ কিলোওয়াট হলে ৮৪ টাকা। মিটার ভাড়া আপনার বিলে যা লেখা আছে তা-ই। এই দুই লাইন নিয়ে বিস্তারিত পাবেন ডিমান্ড চার্জ, লোড ও মিটার ভাড়া গাইডে।
আমাদের উদাহরণে ডিমান্ড চার্জ ৪২.০০ আর মিটার ভাড়া ০।
চতুর্থ অংশ: ভ্যাট ৫%
ভ্যাট বসে শুধু ইউনিটের দামের ওপর নয়, ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া মিলিয়ে পুরো যোগফলের ওপর। আমাদের উদাহরণে:
- যোগফল = ১,৯১২.০০ + ৪২.০০ + ০ = ১,৯৫৪.০০
- ভ্যাট ৫% = ৯৭.৭০
- মোট বিল = ২,০৫১.৭০ টাকা
ভ্যাট কীভাবে যোগ বা বাদ দিতে হয়, সেই সাধারণ নিয়ম জানতে দেখুন ভ্যাট যোগ ও বাদ দেওয়ার হিসাব।
টুলে কীভাবে করবেন
- টুল খুলে মাসের মোট ইউনিট বসান (বিলে “মোট ব্যবহার” বা “ইউনিট” লেখা থাকে)।
- অনুমোদিত লোড কিলোওয়াটে দিন। না জানলে বিলের কাগজে বা বিতরণ কোম্পানির অ্যাপে দেখুন।
- মিটার ভাড়া বিলে লেখা থাকলে সেই টাকা দিন, নইলে ০ রাখুন।
- ফলাফলে ধাপের টেবিল, ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট ও মোট বিল দেখুন, তারপর নিজের হাতের হিসাবের সঙ্গে মেলান।
টুল খুললে ডিফল্ট হিসেবে ২৫০ ইউনিট, ১ কিলোওয়াট ও মিটার ভাড়া ০ বসানো থাকে, তাই ওপরের উদাহরণের ফল সরাসরি দেখতে পাবেন। আসল বিলের সঙ্গে মেলাতে না পারলে নিজের বিল টুলের সঙ্গে মেলানোর উপায় দেখুন।
দ্বিতীয় উদাহরণ: ৩০০ ইউনিট
এবার ব্যবহার বাড়িয়ে ৩০০ ইউনিট ধরা যাক। লোড ও মিটার ভাড়া আগের মতোই (১ কিলোওয়াট ও ০)। ইউনিটগুলো তিন ধাপে ভাগ হয়: ৭৫ × ৫.২৬ = ৩৯৪.৫০, ১২৫ × ৮.৫০ = ১,০৬২.৫০ এবং ১০০ × ৯.১০ = ৯১০.০০। যোগফল ২,৩৬৭.০০ টাকা। ডিমান্ড চার্জ ৪২ যোগ করলে ২,৪০৯.০০। ভ্যাট ১২০.৪৫। মোট বিল ২,৫২৯.৪৫ টাকা।
২৫০ থেকে ৩০০ ইউনিটে ব্যবহার বেড়েছে ৫০ ইউনিট, আর বিল বেড়েছে ৪৭৭.৭৫ টাকা। এই বাড়তি ৫০ ইউনিট পুরোটাই তৃতীয় ধাপের (২০১–৩০০) হারে গেছে, তাই প্রতি বাড়তি ইউনিটে ভ্যাটসহ প্রায় ৯.৫৬ টাকা।
ইউনিট কীভাবে পাবেন
মাসের ইউনিট বের হয় মিটারের বর্তমান রিডিং থেকে আগের মাসের রিডিং বাদ দিয়ে। যেমন বর্তমান রিডিং ১,২৩৫ আর আগের রিডিং ১,০০০ হলে ইউনিট ২৩৫। বিলে এই সংখ্যা ছাপা থাকে, সেটাই টুলে বসান। টাকার অঙ্ক দেখে ইউনিট আন্দাজ করার চেষ্টা করবেন না, কারণ ধাপের কারণে টাকা আর ইউনিটের সম্পর্ক সরল রেখায় চলে না।
প্রথমবার হিসাব করতে গিয়ে যে ভুলগুলো হয়
- সব ইউনিটকে একই হারে গুণ করা। প্রতিটি ধাপের হার শুধু ওই ধাপের ইউনিটের ওপর খাটে।
- ভ্যাট শুধু ইউনিটের দামের ওপর ধরা। ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়াসহ পুরো যোগফলের ওপর ৫% বসে।
- ডিমান্ড চার্জ ভুলে যাওয়া। ইউনিট যত কমই হোক, এই লাইন থাকে।
- ৬০ ইউনিটেও লাইফলাইন ধরে নেওয়া। লাইফলাইন শুধু ৫০ বা কম ইউনিটের জন্য; ৫১ হলে হিসাব প্রথম ধাপ থেকে শুরু হয়।
- পুরোনো হার ব্যবহার করা। বিলের মাস দেখে নিন, কারণ হার বদলালে আগের মাসের বিল নতুন হারে মেলে না।
সীমাবদ্ধতা ও হালনাগাদ: হারগুলো জুন ২০২৬ বিল-মাস থেকে কার্যকর বিইআরসির মূল্যহার অনুযায়ী, সংবাদ প্রতিবেদন ও বিতরণ কোম্পানির প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে ধরা। বিইআরসি ৪ জুন ২০২৬ লাইফলাইন (৪.৬৩) ও প্রথম ধাপের (৫.২৬) বাড়ানো দাম ফিরিয়ে নিয়েছে। এই টুল বাণিজ্যিক, শিল্প ও সেচের গ্রাহক, বকেয়া, বিলম্ব মাশুল, আগের মাসের সমন্বয় ও প্রিপেইড মিটারের নিয়ম হিসাব করে না। মিটার ভাড়ার কোনো সরকারি হার কোডে ধরা নেই। আপনার বিলে ছাপা অঙ্কই চূড়ান্ত; হার বদলালে টুল হালনাগাদ হবে। হালনাগাদ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬।
সাধারণ প্রশ্ন
২৫০ ইউনিটে বিদ্যুৎ বিল কত আসে?
১ কিলোওয়াট লোড ও মিটার ভাড়া ছাড়া ধরলে ২,০৫১.৭০ টাকা। লোড বা মিটার ভাড়া বেশি হলে অঙ্ক বাড়বে।
সব ইউনিটকে সর্বোচ্চ ধাপের হারে গুণ করলে কি চলে?
না। প্রতিটি ধাপের হার শুধু ওই ধাপের ইউনিটের ওপর খাটে। সর্বোচ্চ ধাপের হারে সবটা গুণ করলে বিল বেশি দেখাবে।
ভ্যাট কিসের ওপর বসে?
ইউনিটের দাম, ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়ার যোগফলের ওপর ৫%।
ডিমান্ড চার্জ কি ইউনিট বাড়লে বাড়ে?
না। এটি অনুমোদিত লোডের ওপর নির্ভর করে, মাসের ইউনিটের ওপর নয়।
