ডিমান্ড চার্জ, অনুমোদিত লোড ও মিটার ভাড়া: বিদ্যুৎ বিলের ছোট লাইনগুলো

অনুমোদিত লোড ১, ২ ও ৩ কিলোওয়াট হলে ২৩৫ ইউনিটের বিল ১,৯০৮.৩৮, ১,৯৫২.৪৮ ও ১,৯৯৬.৫৮ টাকা

বিলের কাগজে ইউনিটের হিসাব বুঝে ফেললেও ডিমান্ড চার্জ আর মিটার ভাড়ার মতো ছোট লাইনে এসে অনেকে আটকে যান। অঙ্ক ছোট বলে চোখ এড়ায়, অথচ বছর ধরে হিসাব করলে এগুলো কম নয়। বিদ্যুৎ বিল ক্যালকুলেটরে ইউনিটের পাশাপাশি অনুমোদিত লোড ও মিটার ভাড়ার ঘর আছে, যাতে এই লাইনগুলোও হিসাবে আসে। এই লেখায় দেখানো হয়েছে লাইনগুলো কী, কীভাবে মোট বিলে ঢোকে এবং কোনটা বদলালে কত তফাত হয়।

ডিমান্ড চার্জ কী

ডিমান্ড চার্জ হলো আপনার সংযোগের জন্য নির্ধারিত অনুমোদিত লোডের ভিত্তিতে একটি স্থির চার্জ। হিসাব সোজা: অনুমোদিত লোড (কিলোওয়াট) × প্রতি কিলোওয়াটে চার্জ। এই টুলে প্রতি কিলোওয়াটে ৪২ টাকা ধরা আছে। বিইআরসির জুন ২০২৬-এর মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণায় ডিমান্ড চার্জ আগের মতোই থাকার কথা বলা হয়েছিল। আপনার বিলে ভিন্ন অঙ্ক থাকলে টুলে হার বদলে নিতে পারেন, এই ঘরটি ভিজিটরের হাতে খোলা।

গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, ডিমান্ড চার্জ ইউনিটের ওপর নির্ভর করে না। মাসে একদম কম বিদ্যুৎ খরচ করলেও লোড একই থাকলে এই চার্জ একই থাকে।

অনুমোদিত লোড কোথায় পাবেন

অনুমোদিত লোড কিলোওয়াটে লেখা থাকে। সংযোগ নেওয়ার সময়ের কাগজে বা মাসিক বিলে খুঁজুন, অথবা আপনার বিতরণ কোম্পানির অ্যাপ বা অফিসে জিজ্ঞেস করুন। ঘরে কত লোড আসলে চলছে, সেটা এখানে বিষয় নয়; বিল হয় কাগজে অনুমোদিত লোডের ভিত্তিতে। লোড জানা না থাকলে টুলে ১ কিলোওয়াট ধরা থাকে, তবে সেটি অনুমান মাত্র।

লোড বাড়লে বিল কত বাড়ে

অনুমোদিত লোড ১, ২ ও ৩ কিলোওয়াটে মোট বিলের তুলনামূলক বার চার্ট
২৩৫ ইউনিটে লোড বাড়লে বিলের পরিবর্তন।

২৩৫ ইউনিট খরচ ধরে, মিটার ভাড়া ০ রেখে লোডের প্রভাব দেখা যাক। ইউনিটের দাম সবক্ষেত্রে একই: ৭৫ × ৫.২৬ + ১২৫ × ৮.৫০ + ৩৫ × ৯.১০ = ১,৭৭৫.৫০ টাকা।

লোডডিমান্ড চার্জভ্যাট ৫%মোট বিল
১ কিলোওয়াট৪২৯০.৮৮১,৯০৮.৩৮
২ কিলোওয়াট৮৪৯২.৯৮১,৯৫২.৪৮
৩ কিলোওয়াট১২৬৯৫.০৮১,৯৯৬.৫৮

প্রতি বাড়তি কিলোওয়াটে মোট বিল বাড়ে ৪৪.১০ টাকা, কারণ ৪২ টাকার ওপর ৫% ভ্যাট যোগ হয় (৪২ × ১.০৫)। ইউনিট কমালে এই ৪৪.১০ টাকা কমে না।

কম ব্যবহার, বেশি লোড: একটি উদাহরণ

ধরুন একটি বাসায় মাসে মাত্র ১০০ ইউনিট খরচ। ইউনিটের দাম ৭৫ × ৫.২৬ + ২৫ × ৮.৫০ = ৬০৭ টাকা। লোড ১ কিলোওয়াট হলে মোট বিল ৬৮১.৪৫ টাকা। একই ব্যবহারে লোড ৩ কিলোওয়াট লেখা থাকলে ডিমান্ড চার্জ ১২৬, মোট বিল ৭৬৯.৬৫ টাকা, অর্থাৎ ৮৮.২০ টাকা বেশি। ব্যবহার একই, পার্থক্য শুধু কাগজের লোডে।

লোড কমানো বা বাড়ানোর আবেদনের নিয়ম বিতরণ কোম্পানি ঠিক করে। সেই নিয়ম এখানে বলা হয়নি, তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আপনার কোম্পানির কাছ থেকে জেনে নিন। দরকারের চেয়ে অনেক কম লোড রাখলে নিরাপত্তা ও সংযোগের দিক থেকেও সমস্যা হতে পারে, শুধু বিল দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

মিটার ভাড়া

মিটার ভাড়া প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক, যা আপনার বিলে আলাদা লাইনে লেখা থাকে। টুলে কোনো সরকারি মিটার ভাড়া ধরে নেওয়া হয় না; আপনি নিজের বিল দেখে অঙ্কটি দেন, নইলে ০ থাকে। মিটারের ধরন ও কোম্পানিভেদে এই অঙ্ক আলাদা হতে পারে।

উদাহরণ: ২৩৫ ইউনিট, লোড ১ কিলোওয়াট, মিটার ভাড়া ১০ টাকা। যোগফল ১,৭৭৫.৫০ + ৪২ + ১০ = ১,৮২৭.৫০। ভ্যাট ৯১.৩৮ (৯১.৩৭৫ থেকে), মোট ১,৯১৮.৮৮ টাকা। মিটার ভাড়া ১০ টাকা হলে মোট বিল বাড়ে ১০.৫০ টাকা, কারণ ভ্যাটও এর ওপর বসে।

ভ্যাট কোন লাইনের ওপর

বিলের লাইনের তালিকা: ইউনিটের দাম, ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া ও ভ্যাট এবং কোনটি ব্যবহারের সঙ্গে বদলায়
কোন লাইন ব্যবহারের সঙ্গে বদলায়, কোনটি বদলায় না।

ভ্যাট হয় ইউনিটের দাম, ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়ার যোগফলের ওপর ৫%। শুধু ইউনিটের দামের ওপর ধরলে ছোট কিন্তু নিয়মিত একটি ভুল থেকে যায়। সাধারণ ভ্যাট যোগ-বাদের নিয়মের জন্য দেখুন ভ্যাট যোগ ও বাদ দেওয়ার হিসাব। পুরো বিলের কাঠামোটি একনজরে চাইলে বিদ্যুৎ বিল কীভাবে হিসাব হয় লেখাটি পড়ুন।

প্রিপেইড মিটারের ক্ষেত্রে

প্রিপেইড মিটারের চার্জের নিয়ম পোস্টপেইডের থেকে আলাদা হতে পারে এবং সময়ে সময়ে বদলেছে। এই টুল পোস্টপেইড আবাসিক বিল হিসাব করে, প্রিপেইডের জন্য নয়। প্রিপেইডের বর্তমান নিয়ম আপনার বিতরণ কোম্পানির ঘোষণায় দেখে নিন।

টুলে কীভাবে করবেন

  1. মাসের ইউনিট দিন।
  2. বিলের কাগজ থেকে অনুমোদিত লোড কিলোওয়াটে বসান।
  3. মিটার ভাড়ার ঘরে বিলের অঙ্ক দিন।
  4. ফলাফলে ডিমান্ড চার্জ ও ভ্যাটের লাইন বিলের সঙ্গে মেলান। না মিললে নিজের বিল টুলের সঙ্গে মেলানোর উপায় লেখাটি দেখুন।

কিলোওয়াট আর ইউনিট এক জিনিস নয়

নামে মিল থাকলেও কিলোওয়াট ও ইউনিট আলাদা। কিলোওয়াট হলো ক্ষমতা, অর্থাৎ একটি যন্ত্র বা সংযোগ এক মুহূর্তে কত বিদ্যুৎ টানতে পারে। ইউনিট হলো কিলোওয়াট-ঘণ্টা, অর্থাৎ সময় ধরে কত বিদ্যুৎ খরচ হলো। ১ কিলোওয়াটের একটি যন্ত্র এক ঘণ্টা চললে এক ইউনিট খরচ হয়। ডিমান্ড চার্জ মাপা হয় কিলোওয়াটে (লোড ধরে), আর ইউনিটের দাম মাপা হয় ইউনিটে (ব্যবহার ধরে)। তাই দুটি আলাদা ঘরে বসাতে হয়।

লোড বদলের বার্ষিক হিসাব

প্রতি কিলোওয়াটের ডিমান্ড চার্জ ভ্যাটসহ ৪৪.১০ টাকা, অর্থাৎ বছরে ৪৪.১০ × ১২ = ৫২৯.২০ টাকা। লোড দুই কিলোওয়াট বেশি লেখা থাকলে বছরে প্রায় ১,০৫৮ টাকা বেশি যায়। বিলের কাগজে লোডের অঙ্কটি তাই একবার ভালো করে দেখে নেওয়া উচিত।

বিলের লাইনগুলো কোন ক্রমে পড়বেন

  1. আগের ও বর্তমান রিডিং থেকে ইউনিট।
  2. ইউনিটের দাম, যা ধাপে ধাপে হিসাব হয়।
  3. ডিমান্ড চার্জ: লোড × প্রতি কিলোওয়াটের চার্জ।
  4. মিটার ভাড়া।
  5. ভ্যাট: ওপরের তিনটির যোগফলের ৫%।
  6. বকেয়া, বিলম্ব মাশুল বা সমন্বয়, যদি থাকে। এগুলো এই টুলের বাইরে।

সীমাবদ্ধতা ও হালনাগাদ: ডিমান্ড চার্জ প্রতি কিলোওয়াটে ৪২ টাকা ধরা হয়েছে, বিইআরসির ঘোষণা অনুযায়ী আগের হার অপরিবর্তিত থাকার ভিত্তিতে; এটি বিইআরসির মূল প্রজ্ঞাপনে মেলানো হয়নি, তাই বিলের সঙ্গে মিলিয়ে নিন। কিছু ওয়েবসাইটে ভিন্ন অঙ্ক দেখা যায়, বিলের অঙ্কই ধরবেন। বাণিজ্যিক বা শিল্প সংযোগ, বকেয়া ও বিলম্ব মাশুল এই টুলে নেই। হালনাগাদ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬।

সাধারণ প্রশ্ন

ডিমান্ড চার্জ কি ব্যবহার না করলেও দিতে হয়?

এই হিসাবে হ্যাঁ। ডিমান্ড চার্জ লোডের ওপর নির্ভর করে, মাসের ইউনিটের ওপর নয়।

লোড ২ কিলোওয়াট হলে ডিমান্ড চার্জ কত?

প্রতি কিলোওয়াটে ৪২ টাকা ধরলে ৮৪ টাকা, ভ্যাটসহ ৮৮.২০ টাকা।

মিটার ভাড়ার ওপর ভ্যাট লাগে কি?

এই টুলের হিসাবে হ্যাঁ: ইউনিটের দাম, ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়ার যোগফলের ওপর ৫%।