
হালনাগাদ নোট: এই লেখার কিছু হার এখনো মূল সরকারি নথির সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া হয়নি (বেতন আয়ের করমুক্ত অংশ)। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সর্বশেষ প্রজ্ঞাপনে দেখে নিন।
বেতন-স্লিপে প্রতি মাসে “আয়কর” নামে কিছু টাকা কাটা পড়ে। অনেকেই ভাবেন ওটাই বছরের পুরো কর, রিটার্নে আর কিছু করার নেই। আসলে অফিস যা কাটে তা আগাম কর; বছর শেষে আপনার আসল কর বের হয়, আর কাটা টাকা সেখান থেকে বাদ যায়। কম কাটা থাকলে বাকিটা দিতে হয়, বেশি কাটা থাকলে ফেরতের দাবি তোলা যায়। এই গাইডে পাঁচটি কাল্পনিক পরিস্থিতিতে দেখবেন সমন্বয়টা কেমন দেখায়। নিজের সংখ্যা মেলাতে বেতন থেকে আয়কর ক্যালকুলেটর-এর “উৎসে ইতিমধ্যে কাটা কর” ঘরটি কাজে লাগবে।

অফিসের কাটা কর চূড়ান্ত কর নয়
বেতন থেকে কর কাটার দায়িত্ব নিয়োগকর্তার। তিনি সাধারণত বছরের আনুমানিক মোট বেতন ধরে তার ওপর করের গড় হার বের করেন, তারপর প্রতি মাসে সেই হারে কাটেন। উদাহরণের বেতনে বছরের কর ৳ ৩৪,৬০০ আর মোট বেতন ৳ ১০,৯৬,০০০, অর্থাৎ গড় হার প্রায় ৩.১৬%; শতকরা ক্যালকুলেটরে ৩৪,৬০০ কে ১০,৯৬,০০০-এর শতকরা বের করে মিলিয়ে নিতে পারেন। মাসে তাই প্রায় ৳ ২,৮৮৩।
সমস্যা হয় তখন, যখন অফিসের ধরা আনুমানিক আয় আর বছরের শেষের আসল আয় মেলে না। বোনাস পরে ঘোষণা হয়, আপনি নিজের বিনিয়োগের কথা হিসাব বিভাগকে জানাননি, বছরের মাঝে চাকরি বদলেছে, কিংবা অফিস ভুল করদাতার ধরন ধরেছে। তখন কাটা টাকা আর আসল কর আলাদা হয়ে যায়। রিটার্ন সেই ফারাকটাই মেটানোর জায়গা। বেতনের করের পুরো ছয় ধাপ আছে বেতন থেকে আয়কর হিসাব গাইডে।
পাঁচটি পরিস্থিতিতে সমন্বয়ের ছক
প্রথম চার সারিতে মাসে মোট বেতন ৳ ৮৩,০০০ (মূল ৫০,০০০, বাড়িভাড়া ২৫,০০০, চিকিৎসা ৫,০০০, যাতায়াত ৩,০০০) আর বছরে বোনাস ৳ ১,০০,০০০। বার্ষিক মোট বেতন ৳ ১০,৯৬,০০০, করমুক্ত অংশ ৳ ৩,৬৫,৩৩৩, করযোগ্য আয় ৳ ৭,৩০,৬৬৭। সাধারণ করদাতার কর ৳ ৩৪,৬০০। প্রথম ও তৃতীয় সারিতে আসল কর এই ৳ ৩৪,৬০০-ই; দ্বিতীয় ও চতুর্থ সারিতে রেয়াত বা করদাতার ধরনের কারণে কর কমে, আর পঞ্চম সারিতে বেতনই আলাদা (নিচে বলা আছে)।
| পরিস্থিতি | আসল বার্ষিক কর | উৎসে কাটা | ফল |
|---|---|---|---|
| ১. অফিস বোনাস ধরেনি, মাসে ৳ ২,২০০ করে কেটেছে | ৳ ৩৪,৬০০ | ৳ ২৬,৪০০ | বাকি ৳ ৮,২০০ |
| ২. ৳ ১,৫০,০০০ বিনিয়োগ আছে, অফিস জানে না; পুরো ৳ ৩৪,৬০০ কেটেছে | ৳ ১৯,৬০০ | ৳ ৩৪,৬০০ | বেশি কাটা ৳ ১৫,০০০ |
| ৩. বছরে দুই অফিস: ৳ ১৪,০০০ ও ৳ ১৮,০০০ | ৳ ৩৪,৬০০ | ৳ ৩২,০০০ | বাকি ৳ ২,৬০০ |
| ৪. নারী করদাতা, অফিস সাধারণ ধরে ৳ ৩৪,৬০০ কেটেছে | ৳ ২৮,০৬৭ | ৳ ৩৪,৬০০ | বেশি কাটা ৳ ৬,৫৩৩ |
| ৫. মাসে ৳ ৪৫,০০০ বেতন, বোনাস নেই; অফিস মোট ৳ ৩,০০০ কেটেছে | ৳ ০ | ৳ ৩,০০০ | বেশি কাটা ৳ ৩,০০০ |
দ্বিতীয় সারিতে রেয়াত হয় ৳ ১৫,০০০ (বিনিয়োগের ১০%, কারণ করযোগ্য আয়ের ৩% হতো ৳ ২১,৯২০, তাই ছোটটি খাটে), আসল কর নামে ৳ ১৯,৬০০-এ, যা ন্যূনতম করের ৳ ৫,০০০-এর ওপরে। রেয়াতের সীমা কীভাবে চেপে ধরে, তা আছে বিনিয়োগ রেয়াত গাইডে। চতুর্থ সারির নারী করদাতার করমুক্ত সীমা সাধারণের চেয়ে বেশি, তাই কর কম; সীমাগুলো আছে করমুক্ত সীমা ২০২৬-২৭ গাইডে। পঞ্চম সারিতে মোট বেতন ৳ ৫,৪০,০০০, করযোগ্য আয় ৳ ৩,৬০,০০০, যা ৳ ৪,০০,০০০-এর নিচে, তাই কর শূন্য।

রিটার্নে এই সমন্বয় কোথায় বসে
ছবির চার ধাপ হলো পুরো ব্যাপারটা। অফিস মাসে মাসে কাটে; বছর শেষে আপনার আসল কর হিসাব হয়; রিটার্নে আপনি জানান অফিস মোট কত কেটেছে; আসল করের সঙ্গে সেই কাটা অঙ্ক মেলে। কাটা কর কম হলে বাকিটা আপনার দেয়, বেশি হলে ফেরতের দাবি তোলা যায়। এই গাইডের লেখার সময় যে সূত্র পাওয়া গেছে, তাতে রিটার্নে উৎসে কাটা করের “ক্রেডিট” দাবির কথা আছে; পোর্টালের কোন ঘরে কী বসে, তা নিজে পোর্টালে বসে দেখা হয়নি। ধাপে ধাপে রিটার্ন দাখিলের কাজ আছে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন গাইডে।
সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে একটি সূত্র বলছে, এনবিআরের ই-রিটার্ন নির্দেশিকায় iBAS থেকে বেতন বাবদ কাটা করের তথ্য মিলিয়ে দাবি করার পদ্ধতি আছে। বেসরকারি চাকরিতে সাধারণ প্রমাণ হলো অফিসের দেওয়া কর কর্তনের সনদ। এ বছর সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় কাটা করও রিটার্নে সমন্বয় হবে, সঙ্গে প্রত্যয়নপত্র দিতে হবে, এমন একটি প্রতিবেদন (১৯ জুলাই ২০২৬) পাওয়া গেছে; অর্থাৎ বেতনের বাইরেও কাটা করের কাগজ সামলে রাখতে হবে।
রিটার্নের আগে হাতে রাখার কাগজ
- বছরের সব বেতন-স্লিপ, আর অফিসের কাছ থেকে বছরের মোট কাটা করের হিসাব বা সনদ।
- বছরে দুই অফিসে কাজ করলে দুই জায়গার আলাদা সনদ। তৃতীয় সারির ৳ ১৪,০০০ ও ৳ ১৮,০০০ দুটো মিলিয়েই ৳ ৩২,০০০।
- বেতন ব্যাংকে এলে স্টেটমেন্টে কাটা অঙ্ক, যাতে স্লিপের সঙ্গে মেলানো যায়।
- বিনিয়োগের প্রমাণ (ডিপিএস, সঞ্চয়পত্র, বীমা), কারণ অফিস না জানলে রেয়াত রিটার্নেই আসে।
- আপনার টিআইএন ও করদাতার ধরন (সাধারণ, নারী, প্রতিবন্ধী ইত্যাদি) অফিসের হিসাবে ঠিক আছে কি না।
কম কাটা পড়লে আর বেশি কাটা পড়লে
কম কাটা পড়লে (প্রথম ও তৃতীয় সারি) বাকি অঙ্ক আপনার দেয়। বছরের মাঝে টের পেলে অফিসকে বলে বাকি মাসে বেশি কাটানো যায়: প্রথম সারির ৳ ৮,২০০ ছয় মাসে ভাগ করলে মাসে প্রায় ৳ ১,৩৬৭। টুলের “বাকি মাসে প্রতি মাসে উৎসে কাটা দরকার” ঘর ঠিক এই হিসাব দেয়। বছর শেষে ধরা পড়লে রিটার্নে বাকি অঙ্কটি দেখায়; কখন, কীভাবে ও কোনো অতিরিক্ত কর লাগে কি না, তা এই গাইডে যাচাই হয়নি।
বেশি কাটা পড়লে (দ্বিতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম সারি) টুল দেখায় “উৎসে বেশি কাটা (ফেরতযোগ্য হতে পারে)”। “হতে পারে” কথাটা ইচ্ছা করেই: ফেরতের আবেদন কীভাবে হয়, কত সময় লাগে, আর কোনো শর্ত আছে কি না, এসব এনবিআরের নির্দেশনায় দেখে নিতে হবে। দাবি তোলার আগে বেশি কাটা অঙ্কটি নিজে টুলে ও কাগজে মিলিয়ে নিন।
টুলে নিজের হিসাব মেলান
- বেতন থেকে আয়কর ক্যালকুলেটরে মূল বেতন ৫০,০০০, বাড়িভাড়া ২৫,০০০, চিকিৎসা ৫,০০০, যাতায়াত ৩,০০০ ও বোনাস ১,০০,০০০ দিন। বার্ষিক কর ৳ ৩৪,৬০০ আসবে।
- “উৎসে ইতিমধ্যে কাটা কর” ঘরে ২৬,৪০০ দিন। “উৎসে কাটার পর আরও দেয়” ঘরে ৳ ৮,২০০ দেখাবে। “আয়বছরের বাকি মাস” ৬ দিলে মাসে ৳ ১,৩৬৭ আসবে।
- কাটা কর ৩৪,৬০০ করে “অনুমোদিত বিনিয়োগ ও দান” ১,৫০,০০০ দিন। বার্ষিক কর নামবে ৳ ১৯,৬০০-এ, আর ৳ ১৫,০০০ বেশি কাটা দেখাবে।
- করদাতার ধরন “নারী বা ৬৫+ বছর” বেছে বিনিয়োগ ০ করুন। কর ৳ ২৮,০৬৭, কাটা ৳ ৩৪,৬০০ হলে বেশি কাটা ৳ ৬,৫৩৩।
- বেতনের বাইরে অন্য আয় থাকলে আয়কর ক্যালকুলেটরে মোট করযোগ্য আয় বসিয়ে কর মেলান। ৳ ৭,৩০,৬৬৭ দিলে ৳ ৩৪,৬০০ আসবে।
বোনাস ঘোষণার পর মাসের কাটা কেন বদলায়, তার আলাদা হিসাব আছে বোনাস ও ভাতা যোগ হলে মাসিক কর গাইডে, আর বেতনের করমুক্ত অংশের হিসাব এক-তৃতীয়াংশ বা ৫ লাখ গাইডে।
সূত্র ও যাচাইয়ের অবস্থা: উৎসে কাটা কর চূড়ান্ত করের সঙ্গে সমন্বয় হতে পারে, আর কাটা করের ক্রেডিট রিটার্নে দাবি করা যায়: বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস (bdservicerules.info, ১৪ অক্টোবর ২০২৬), যা আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ৮৬ ধরে লেখা; ধারাটির পাঠ আমরা নিজে খুলে দেখিনি। গড় হারে কাটার বর্ণনা: mihcm-এর নিয়োগকর্তার গাইড। সঞ্চয়পত্রের কাটা কর সমন্বয়: বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন (১৯ জুলাই ২০২৬)। করমুক্ত সীমা, স্ল্যাব, রেয়াত ও ন্যূনতম কর: অর্থ আইন ২০২৬ ও আয়কর আইন ২০২৩, এনবিআর, টুলের হার-তালিকা অনুযায়ী; বেতনের এক-তৃতীয়াংশ বা ৳ ৫,০০,০০০ হার মূল গেজেটে এখনো মেলানো হয়নি। যাচাই-না-হওয়া: ফেরতের আবেদনের নিয়ম ও সময়, রিটার্নের কোন ঘরে কাটা কর বসে, কর সনদের নাম ও ফরম, অফিস কর কেটে জমা না দিলে কী হয়, কম কাটার জন্য আলাদা জরিমানা আছে কি না। একটি সূত্রে ২০২৬-২৭ করবর্ষের সাধারণ করমুক্ত সীমা ৳ ৩,৭৫,০০০ লেখা আছে; টুল ও এই গাইড ৳ ৪,০০,০০০ ধরে, তাই সীমা এনবিআরের মূল নথিতে মিলিয়ে নিন। কাল্পনিক: সব বেতন, বোনাস, বিনিয়োগ ও কাটা অঙ্ক। এটি আনুমানিক হিসাব ও সাধারণ তথ্য, আইনি বা কর পরামর্শ নয়; কাটার আসল অঙ্ক প্রতিষ্ঠানের হিসাব বিভাগের হিসাবে চূড়ান্ত। সর্বশেষ হালনাগাদ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬।
সাধারণ প্রশ্ন
অফিস কর কেটে দিলে কি আলাদা রিটার্ন দিতে হয়?
কাটা কর রিটার্নের বিকল্প নয়। কে রিটার্ন দেবেন, তা এনবিআরের ঘোষণায় ঠিক হয়; ছাড়ের তালিকা ও সময় আছে ই-রিটার্নের গাইডে। যাঁদের রিটার্ন দিতে হয়, তাঁদের কাটা কর সেখানেই বাদ যায়।
অফিস কর না কাটলে আমি কী করব?
তাতে করের দায় বদলায় না। টুলে কাটা কর ০ দিলে পুরো বার্ষিক কর “আরও দেয়” হিসেবে দেখায়। প্রথম সারির মতো বছরের মাঝে টের পেলে বাকি মাসে ভাগ করে কাটাতে বলা যায়।
বেশি কাটা কর কি নিজে নিজে ফেরত আসে?
আমাদের জানা সূত্রে তা বলা নেই। টুল শুধু “ফেরতযোগ্য হতে পারে” বলে। ফেরতের দাবির নিয়ম এই গাইডে যাচাই হয়নি, এনবিআরের নির্দেশনা দেখুন।
কর কর্তনের সনদ হারিয়ে গেলে কী হবে?
অফিসের হিসাব বিভাগ থেকে আবার চান। সনদের নাম ও ফরম এই গাইডে যাচাই হয়নি, তাই অফিসকে জিজ্ঞেস করুন কোন কাগজ দেবে।
বছরে দুই অফিস থেকে বেতন পেলে কর কীভাবে মেলে?
দুই অফিসের বেতন ও কাটা কর আলাদা সনদে আসে। বার্ষিক মোট বেতন যোগ করে একবারই কর হিসাব হয়, আর দুই কাটা যোগ করে বাদ যায়। তৃতীয় সারিতে ৳ ১৪,০০০ ও ৳ ১৮,০০০ মিলে ৳ ৩২,০০০ বাদ গিয়ে বাকি থাকে ৳ ২,৬০০।
