
কর হিসাবের পর অনেকে জিজ্ঞেস করেন, কোথাও টাকা রাখলে কি কর কমে? উত্তর হ্যাঁ, তবে নিয়মটা যত সহজ শোনায়, তত সহজ নয়। এই গাইডে দেখবেন রেয়াত আসলে কী, ২০২৬-২৭ করবর্ষে তার সীমা কত, কোন খাতে টাকা রাখলে ধরা হয়, আর বিনিয়োগের সিদ্ধান্তের আগে কী ভাবা দরকার। নিজের সংখ্যা বসিয়ে দেখতে আয়কর ক্যালকুলেটর খুলে রাখুন।

রেয়াত আয় থেকে বাদ যায় না, কর থেকে যায়
এখানে সবচেয়ে বড় ভুল বোঝাবুঝি। বিনিয়োগ করলে আপনার করযোগ্য আয় কমে না। আগে স্ল্যাব ধরে কর হিসাব হয়, তারপর সেই কর থেকে রেয়াতের অঙ্ক সরাসরি বাদ যায়। তাই ৳ ৩,০০,০০০ বিনিয়োগ করলে কর ৳ ৩,০০,০০০ কমে না। কত কমবে, তা ঠিক করে নিচের সীমাগুলো। স্ল্যাব ধরে কর কীভাবে বের হয়, তা আছে ব্যক্তিগত আয়কর হিসাব ২০২৬-২৭ গাইডে।
২০২৬-২৭ করবর্ষের সীমা: তিনটির মধ্যে যেটি কম
রেয়াতের পরিমাণ এই তিনটির মধ্যে যেটি সবচেয়ে কম:
- করযোগ্য আয়ের ৩%;
- অনুমোদিত খাতে আপনার বিনিয়োগের ১০%;
- ৳ ৭,৫০,০০০।
আগের বছরের নিয়মে বিনিয়োগের অংশ ছিল ১৫% আর সর্বোচ্চ সীমা ৳ ১০,০০,০০০। সংবাদ প্রতিবেদন ও কর-পরামর্শ সাইটগুলো একই কথা লিখেছে: এবার হার ও সীমা দুটোই কমেছে। এর সোজা মানে, প্রতি এক লাখ টাকা বিনিয়োগে আগের চেয়ে ৳ ৫,০০০ কম ছাড় মেলে। আগে ৳ ১,০০,০০০ বিনিয়োগে ৳ ১৫,০০০ রেয়াত পেতে পারতেন, এখন সর্বোচ্চ ৳ ১০,০০০।
কোন সীমা কখন চেপে ধরে
তিনটি কাল্পনিক উদাহরণে দেখা যাক। আয় মানে করযোগ্য আয়, বিনিয়োগ মানে অনুমোদিত খাতে বছরে মোট বিনিয়োগ।
| করযোগ্য আয় | বিনিয়োগ | আয়ের ৩% | বিনিয়োগের ১০% | রেয়াত |
|---|---|---|---|---|
| ৳ ৬,০০,০০০ | ৳ ৫,০০,০০০ | ৳ ১৮,০০০ | ৳ ৫০,০০০ | ৳ ১৮,০০০ |
| ৳ ১২,০০,০০০ | ৳ ৩,০০,০০০ | ৳ ৩৬,০০০ | ৳ ৩০,০০০ | ৳ ৩০,০০০ |
| ৳ ৩,০০,০০,০০০ | ৳ ১,০০,০০,০০০ | ৳ ৯,০০,০০০ | ৳ ১০,০০,০০০ | ৳ ৭,৫০,০০০ |

প্রথম উদাহরণে বিনিয়োগ বেশি, কিন্তু আয় কম বলে ৩%-এর সীমায় আটকে গেছে। ৳ ৫,০০,০০০ রাখার পরও রেয়াত ৳ ১৮,০০০-এর বেশি হয়নি। দ্বিতীয়টি আপনি আয়কর গাইডের উদাহরণের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারেন: ১২ লাখ আয়ে ৳ ৩,০০,০০০ বিনিয়োগে রেয়াত ৳ ৩০,০০০। তৃতীয়টি শুধু বড় আয়ের জন্য। সাড়ে সাত লাখের সীমায় পৌঁছাতে করযোগ্য আয় আড়াই কোটি টাকার বেশি আর বিনিয়োগ ৭৫ লাখের বেশি লাগে। বেশির ভাগ করদাতার জন্য কাজ করে প্রথম দুটি সীমা।
এক কাজের হিসাব: কতটা রাখলে আর লাভ নেই
আয়ের ৩% পুরো পেতে বিনিয়োগের ১০% সেই অঙ্কের সমান হতে হবে। অর্থাৎ বিনিয়োগ লাগে আয়ের ৩০%। ৳ ১২,০০,০০০ আয়ে এই অঙ্ক ৳ ৩,৬০,০০০, তখন রেয়াত ৳ ৩৬,০০০। এর বেশি রাখলে রেয়াত আর বাড়ে না। শুধু কর কমানোর জন্য বিনিয়োগ করতে চাইলে এই সীমার ওপরে যাওয়ার কোনো কর-যুক্তি নেই। কোনো অঙ্ক বা শতাংশ ঝালিয়ে নিতে শতকরা ক্যালকুলেটর কাজে লাগবে।
১২ লাখ আয়ে পুরো হিসাব এক নজরে
| ধাপ | অঙ্ক |
|---|---|
| স্ল্যাব ধরে কর (করযোগ্য আয় ৳ ১২,০০,০০০) | ৳ ১,১০,০০০ |
| রেয়াত (৳ ৩,০০,০০০ বিনিয়োগে) | − ৳ ৩০,০০০ |
| রেয়াতের পর কর | ৳ ৮০,০০০ |
কর কমল প্রায় ২৭%, কিন্তু আপনি ৳ ৩,০০,০০০ হারাননি। টাকাটা ডিপিএস বা সঞ্চয়পত্রে আছে, মুনাফাসহ ফেরত আসবে। কর বাঁচল ঠিক ৳ ৩০,০০০, মানে বিনিয়োগের ১০%। এই অঙ্কটাই ঠিক করে দেয় বিনিয়োগটা শুধু কর-হিসাবে কতটা কাজের।
কোথায় টাকা রাখলে রেয়াতে ধরা হয়
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস, জীবন বীমার প্রিমিয়ামসহ মোট নয়টি খাতে বিনিয়োগ রেয়াতের আওতায় পড়ে। খাতের তালিকা এবারের বাজেটে মোটামুটি একই আছে। সবচেয়ে চেনা কয়েকটি:
- ডিপিএস: যেকোনো তফসিলি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মাসিক কিস্তির সঞ্চয়। বছরে সর্বোচ্চ ৳ ১,২০,০০০ (মাসে ৳ ১০,০০০) পর্যন্ত রেয়াতের জন্য ধরা হয়; এই সীমা বহাল আছে বলে প্রতিবেদনে এসেছে। কিস্তি ও মেয়াদ শেষে কত পাবেন দেখতে ডিপিএস ক্যালকুলেটর ও ডিপিএস মুনাফার গাইড দেখুন।
- সঞ্চয়পত্র: সরকার অনুমোদিত সঞ্চয়পত্র কেনা। মুনাফা, কর কাটা ও অন্য মাধ্যমের সঙ্গে তুলনা আছে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা হিসাব গাইডে।
- জীবন বীমার প্রিমিয়াম: কর-পরামর্শ সাইটগুলো লিখছে, বিমাকৃত অঙ্কের ১০%-এর বেশি প্রিমিয়াম ধরা হয় না।
- আরও যা সাধারণত তালিকায় থাকে: তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার বা মিউচুয়াল ফান্ড, সরকারি প্রভিডেন্ট ফান্ডে চাঁদা, ট্রেজারি বন্ড।
- দান: প্রতিবেদন অনুযায়ী এবার সংসদে অর্থ আইন পাসের সময় সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্টে দান রেয়াতযোগ্য দানের তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
একটা সতর্কতা: প্রতিটি খাতের নিজস্ব শর্ত ও সীমা আছে, আর সূত্রভেদে বর্ণনা একটু আলাদা। তালিকার শেষ কথা আয়কর আইন ২০২৩ ও এনবিআরের নির্দেশিকা, তাই টাকা রাখার আগে সেখানে মিলিয়ে নিন।
টাকা রাখার আগে চারটি কথা ভাবুন
- রেয়াত ফেরত নয়। ৳ ১,০০,০০০ রাখলে কর কমে সর্বোচ্চ ৳ ১০,০০০। বাকি ৳ ৯০,০০০ আপনারই, কিন্তু মেয়াদ বা শর্তে আটকে থাকে। ডিপিএস মাঝপথে ভাঙলে মুনাফা কমতে পারে।
- কর কমানো সিদ্ধান্তের একটি কারণ, একমাত্র কারণ নয়। আগে ঠিক করুন কত টাকা কত দিন না ছুঁয়ে রাখতে পারবেন। রেয়াতের হার মাত্র ১০%, তাই কর বাঁচাতে এমন বিনিয়োগে ঢোকা ঠিক নয় যা আপনার প্রয়োজনে ফেরত পাবেন না।
- বছর মিলিয়ে দেখুন। সাধারণ নিয়মে কর বছর ২০২৬-২৭-এর রিটার্নে আগের আয়বছর (জুলাই ২০২৫ থেকে জুন ২০২৬)-এর বিনিয়োগ ধরা হয়। আজ অক্টোবর ২০২৬; এখন রাখা টাকা সাধারণত পরের করবর্ষের হিসাবে যায়। নিজের ক্ষেত্রে নিশ্চিত হয়ে নিন।
- মুনাফার ওপর কাটা কর আলাদা। সঞ্চয়পত্র বা ব্যাংকের মুনাফায় উৎসে যে কর কাটে, তা রেয়াত নয়। রিটার্নে ওটা আগাম দেওয়া কর হিসেবে যায়, আর রেয়াত যায় ভিন্ন ঘরে।
রিটার্নে দাবি করতে কী লাগে
রেয়াত নিজে নিজে বসে না, রিটার্নে আপনাকে দাবি করতে হয়, আর প্রমাণ রাখতে হয়। সাধারণত লাগে ডিপিএস বা সঞ্চয়ের ব্যাংক বিবৃতি, বীমা প্রিমিয়ামের রসিদ, সঞ্চয়পত্র কেনার তথ্য ও দানের প্রাপ্তিস্বীকার। দাখিলের ধাপ, কখন দিলে প্রণোদনা মেলে আর কাগজপত্রের তালিকা আছে অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের ধাপ গাইডে। বেতনভোগী হলে করমুক্ত অংশের আলাদা হিসাব দেখুন বেতন থেকে আয়কর হিসাব গাইডে।
টুলে নিজের হিসাব মেলান
- আয়কর ক্যালকুলেটরে আপনার করযোগ্য আয় বসান, কর দেখুন।
- বিনিয়োগের অঙ্ক বসিয়ে রেয়াত দেখুন; আয়ের ৩% আর বিনিয়োগের ১০% মিলিয়ে নিন।
- দেখুন রেয়াতের পর কত কর বাকি থাকে। রেয়াতের পরও ন্যূনতম কর প্রযোজ্য হতে পারে, তাই এই অঙ্কও যাচাই করুন।
- বিনিয়োগ ডিপিএসে গেলে ডিপিএস ক্যালকুলেটরে মাসিক কিস্তি আর মেয়াদ শেষের অঙ্ক মেলান।
সূত্র ও হালনাগাদ: অর্থ আইন ২০২৬ ও আয়কর আইন ২০২৩, এনবিআর; বাজেট ও অর্থ বিল নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন (জুন ২০২৬)। সর্বশেষ হালনাগাদ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬। মূল গেজেট আমরা নিজে খুলে মিলিয়ে দেখিনি, তাই রিটার্ন জমার আগে এনবিআরের সর্বশেষ নির্দেশনা বা কর পরামর্শকের সঙ্গে মিলিয়ে নিন। এটি আনুমানিক হিসাব ও সাধারণ তথ্য, আইনি বা কর পরামর্শ নয়।
সাধারণ প্রশ্ন
বিনিয়োগ রেয়াত আর করমুক্ত আয়ের সীমা কি একই জিনিস?
না। করমুক্ত সীমা হলো আয়ের যে অংশের ওপর কর বসে না। রেয়াত হলো হিসাব করা কর থেকে বাদ যাওয়া অঙ্ক, যা অনুমোদিত খাতে বিনিয়োগ বা দানের সঙ্গে জড়িত।
আয়ের ৩% পুরো রেয়াত পেতে কত বিনিয়োগ করতে হবে?
আয়ের ৩০%। বিনিয়োগের ১০% যখন আয়ের ৩%-এর সমান হয়, তখন সীমা পূর্ণ হয়। এর বেশি বিনিয়োগে রেয়াত আর বাড়ে না, যদি না আয় বাড়ে।
এ বছর কি রেয়াত আগের চেয়ে কমে গেছে?
হ্যাঁ। প্রতিবেদন অনুযায়ী বিনিয়োগের অংশ ১৫% থেকে ১০% আর সর্বোচ্চ সীমা ৳ ১০,০০,০০০ থেকে ৳ ৭,৫০,০০০ হয়েছে। আয়ের ৩% সীমা আগের মতোই।
এখন অক্টোবরে বিনিয়োগ করলে কি এ বছরের রিটার্নে ধরা যাবে?
সাধারণ নিয়মে এ বছরের রিটার্নে আয়বছর ২০২৫-২৬-এর বিনিয়োগ ধরা হয়, তাই এখনকার বিনিয়োগ সাধারণত পরের করবর্ষে যাবে। নিজের ক্ষেত্রে এনবিআরের নির্দেশনা বা কর পরামর্শকের কাছে নিশ্চিত হয়ে নিন।
রেয়াতের পর কর শূন্য হয়ে গেলে কি কিছুই দিতে হবে না?
দেখতে হবে ন্যূনতম কর প্রযোজ্য কি না। করযোগ্য আয় করমুক্ত সীমার ওপরে থাকলে সাধারণত ন্যূনতম কর লাগে। বিস্তারিত আছে আয়কর হিসাব গাইডে; ন্যূনতম করের দুই অঙ্ক নিয়ে আলাদা গাইড ন্যূনতম কর ২০২৬-২৭।
