অনলাইনে আয়কর রিটার্ন (ই-রিটার্ন) দাখিলের ধাপ ২০২৬-২৭

ই-রিটার্ন কখন দিলে কী হয়: জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে প্রদেয় নিট করের ৫% প্রণোদনা, সর্বোচ্চ ৳ ২৫,০০০; অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে প্রণোদনা বা অতিরিক্ত কর কোনোটিই নেই; ডিসেম্বরের পর অতিরিক্ত কর

কর বছর ২০২৬-২৭ থেকে বেশির ভাগ ব্যক্তিকরদাতাকে আয়কর রিটার্ন অনলাইনে জমা দিতে হচ্ছে। কাগজের ফর্ম নিয়ে কর অফিসে যাওয়ার পুরোনো পথ এখন কেবল নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির জন্য খোলা। এই গাইডে দেখবেন নিয়মটা কী, কারা ছাড় পান, কখন দিলে সুবিধা বা বাড়তি খরচ, আর পোর্টালে ধাপে ধাপে কী করতে হয়। রিটার্নে কত কর আসবে তা আগে জেনে নিতে আয়কর ক্যালকুলেটর খুলে রাখুন।

ই-রিটার্ন কখন দিলে কী হয়: জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে প্রদেয় নিট করের ৫% প্রণোদনা, সর্বোচ্চ ৳ ২৫,০০০; অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে প্রণোদনা বা অতিরিক্ত কর কোনোটিই নেই; ডিসেম্বরের পর অতিরিক্ত কর

এ বছর কী বদলেছে

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ২২ জুলাই ২০২৬ থেকে কর বছর ২০২৬-২৭-এর ই-রিটার্ন সেবা চালু করেছে। বিশেষ আদেশে সাধারণ ব্যক্তিকরদাতার জন্য অনলাইনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এনবিআর জানিয়েছে, আগের কর বছরে প্রায় ৪৭ লাখ ব্যক্তিকরদাতা অনলাইনে রিটার্ন দিয়েছেন, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। পোর্টালের ঠিকানা etaxnbr.gov.bd।

দ্বিতীয় বড় পরিবর্তন সময়ভিত্তিক সুবিধা: এ বছর থেকে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দিলে প্রদেয় নিট করের ৫% প্রণোদনা আছে, সর্বোচ্চ ৳ ২৫,০০০। সেপ্টেম্বরের পর দিলে প্রণোদনা নেই, আর ডিসেম্বরের পর দিলে অতিরিক্ত কর দিতে হবে।

কারা কাগজে রিটার্ন দিতে পারেন

এনবিআরের ঘোষণা অনুযায়ী অনলাইন বাধ্যতামূলক হওয়ার নিয়ম এই শ্রেণিগুলোর ওপর খাটে না, তাঁরা কাগজে রিটার্ন দিতে পারেন:

  • ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী করদাতা;
  • প্রতিবন্ধী বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন করদাতা, প্রাসঙ্গিক সনদ জমা দিয়ে;
  • বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশি করদাতা;
  • মৃত করদাতার পক্ষে আইনি প্রতিনিধি;
  • বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিক।

এর বাইরে কেউ অনলাইনে নিবন্ধনের সমস্যায় পড়লে সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত বা যুগ্ম কর কমিশনারের অনুমোদন নিয়ে কাগজে দিতে পারেন বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। অনুমোদন ছাড়া কাগজে দেওয়ার আগে নিজের কর অফিসে জেনে নিন।

কখন দিলে কী হয়

দাখিলের সময়কী হয়
জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরপ্রদেয় নিট করের ৫% প্রণোদনা, সর্বোচ্চ ৳ ২৫,০০০
অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরপ্রণোদনা নেই; প্রকাশিত ঘোষণায় এ সময়ে অতিরিক্ত করের কথা নেই
ডিসেম্বরের পরঅতিরিক্ত কর; হার ও স্তর এনবিআরের আদেশে দেখুন

প্রণোদনার অঙ্ক বোঝার জন্য কাল্পনিক তিনটি উদাহরণ ধরা যাক। প্রদেয় নিট কর ৳ ৮০,০০০ হলে ৫% হয় ৳ ৪,০০০। প্রদেয় নিট কর ৳ ৫,০০,০০০ হলে ৫% ঠিক ৳ ২৫,০০০, অর্থাৎ সীমায় পৌঁছায়। ৳ ১০,০০,০০০ হলে ৫% হতো ৳ ৫০,০০০, কিন্তু সীমার কারণে পাওয়া যাবে ৳ ২৫,০০০। নিজের অঙ্ক শতকরা ক্যালকুলেটরে বসিয়ে মিলিয়ে নিতে পারেন।

একটি জরুরি কথা: প্রণোদনা কোন অঙ্কের ওপর হিসাব হবে, উৎসে কাটা কর বাদ গেলে কী দাঁড়ায়, সেটা এই গাইডে যাচাই করা হয়নি। এনবিআর বলছে “প্রদেয় নিট কর”; রিটার্ন তৈরির শেষ ধাপে পোর্টাল আপনার জন্য প্রকৃত অঙ্ক দেখাবে বলে আশা করা যায়, তবু জমার আগে মিলিয়ে নিন।

শুরুর আগে হাতে রাখুন

পোর্টালে বসার আগে কাগজপত্র জোগাড় থাকলে অর্ধেক কাজ সারা। সাধারণভাবে যা লাগে:

  • টিআইএন (ই-টিআইএন) নম্বর;
  • আয় বছরের (১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০ জুন ২০২৬) আয়ের হিসাব: বেতনের সনদ, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, বাড়িভাড়া, ব্যবসা বা অন্য আয়;
  • উৎসে কাটা করের সনদ (বেতন, ব্যাংক সুদ ইত্যাদি থেকে);
  • সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস, জীবন বীমা বা অন্য অনুমোদিত খাতে বিনিয়োগের প্রমাণ;
  • ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের সম্পদ ও দায়ের হিসাব;
  • আগের বছরের রিটার্ন ও প্রাপ্তিস্বীকারপত্র, থাকলে।
ই-রিটার্ন দাখিলের ছয় ধাপ: লগইন বা নিবন্ধন, কর বছর বেছে আয় ভরা, সম্পদ ও দায় লেখা, উৎসে কর ও রেয়াত দাবি, কর পরিশোধ, জমা দিয়ে প্রাপ্তিস্বীকারপত্র ও কর সনদ নামানো
পোর্টালের পর্দা বদলাতে পারে, কিন্তু ধাপের ক্রম সাধারণত এটাই।

ধাপে ধাপে ই-রিটার্ন

নিচের ক্রম একাধিক সূত্র ও এনবিআরের ঘোষণা মিলিয়ে লেখা। এই গাইডের লেখক পোর্টালে নিজে বসে রিটার্ন জমা দিয়ে দেখেননি, তাই বোতাম বা মেনুর নাম আপনার পর্দায় আলাদা হতে পারে।

  1. লগইন বা নিবন্ধন করুন। etaxnbr.gov.bd-তে যান। প্রথমবার হলে নিবন্ধন করতে হয়; সাধারণত টিআইএন ও আপনার নামে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর লাগে এবং ওটিপি আসে। আগে নিবন্ধিত হলে আগের পাসওয়ার্ডেই ঢুকুন।
  2. কর বছর বেছে নিন। এবারের রিটার্ন কর বছর ২০২৬-২৭, যা ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০ জুন ২০২৬ আয়ের জন্য। আগের বছরের তারিখ ধরে ফেললে ভুল বছরের রিটার্ন তৈরি হয়ে যাবে।
  3. আয় লিখুন। বেতন, বাড়িভাড়া, কৃষি, ব্যবসা, মূলধনী লাভ, ব্যাংক সুদ ও সঞ্চয়পত্রের মুনাফা, অন্যান্য: যে খাতে আয় আছে সেখানে অঙ্ক বসান। বেতনের আয়ের করমুক্ত অংশ কীভাবে বাদ যায়, তা আছে বেতন থেকে আয়কর হিসাব গাইডে।
  4. সম্পদ ও দায় লিখুন। ৩০ জুন ২০২৬-এর সম্পদ ও ঋণের অঙ্ক দিন। আগের বছরের সঙ্গে বড় ফারাক থাকলে কারণ ভেবে রাখুন।
  5. উৎসে কর ও রেয়াত দাবি করুন। ইতিমধ্যে কাটা কর, অগ্রিম কর ও বিনিয়োগ রেয়াত এখানে বসে। রেয়াতের সূত্র ও উদাহরণ আছে ব্যক্তিগত আয়কর হিসাব ২০২৬-২৭ গাইডে।
  6. কর পরিশোধ করুন। এনবিআর জানিয়েছে, ই-ট্যাক্স পোর্টালেই ব্যাংক ট্রান্সফার, ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড, বিকাশ, রকেট, নগদ ও অন্য মোবাইল আর্থিক সেবায় কর দেওয়া যায়, কর অফিসে যেতে হয় না।
  7. জমা দিয়ে নামিয়ে রাখুন। সঠিক তথ্যে রিটার্ন সম্পূর্ণ করলে প্রাপ্তিস্বীকারপত্র ও আয়কর সনদ সঙ্গে সঙ্গে নামানো যায়। দুটোই সংরক্ষণ করুন; ঋণ, লাইসেন্সসহ নানা কাজে রিটার্ন জমার প্রমাণ চাওয়া হতে পারে।

বেতনভোগীদের জন্য আলাদা কথা

অফিস মাসে মাসে কর কেটে রাখলে মনে হতে পারে রিটার্নের কিছু বাকি নেই। আসলে কাটা করের সনদ রিটার্নে বসিয়ে মোট দেয় করের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। বছরের আয় ও কাটা কর মিলিয়ে দেখতে বেতনের কর ক্যালকুলেটর কাজে আসবে।

জমার আগে সাধারণ ভুল

  • ভুল কর বছর বাছা: ২০২৫-২৬ আর ২০২৬-২৭ গুলিয়ে ফেলা সবচেয়ে সহজ ভুল।
  • উৎসে কাটা কর বাদ রাখা: সনদ হাতে না থাকলে ব্যাংক বা অফিসের হিসাব বিভাগ থেকে চেয়ে নিন।
  • সম্পদের অঙ্কে অমিল: গত বছরের রিটার্নের সঙ্গে অসংগতি পরে প্রশ্ন তুলতে পারে।
  • শেষ মুহূর্তে বসা: সময়সীমার কাছাকাছি পোর্টাল ধীর হতে পারে, তাই হাতে সময় রেখে শুরু করুন।
  • প্রাপ্তিস্বীকারপত্র না নামানো: জমা হয়ে গেলেও কাগজটি রাখুন।

টুলে আগে হিসাব মেলান

  1. আয়কর ক্যালকুলেটর খুলে সাধারণ করদাতা বেছে করযোগ্য আয় ১২,০০,০০০ দিন। স্ল্যাবের কর ৳ ১,১০,০০০ আসার কথা, যা আয়কর হিসাবের গাইডের উদাহরণের সমান।
  2. রেয়াতের ঘরে ৩,০০,০০০ বিনিয়োগ দিলে দেয় কর ৳ ৮০,০০০ আসবে।
  3. শতকরা ক্যালকুলেটরে ৮০,০০০-এর ৫% বের করুন: ৳ ৪,০০০। এটি কাল্পনিক প্রণোদনার অঙ্ক, আসল অঙ্ক পোর্টাল দেখাবে।
  4. পোর্টালে ওঠা মোট কর ক্যালকুলেটরের ফলের সঙ্গে না মিললে আয়ের খাত ও উৎসে কাটা করের ঘর আবার দেখুন।

সীমাবদ্ধতা ও হালনাগাদ: এই গাইড এনবিআরের ২২ জুলাই ২০২৬-এর ঘোষণা ও একাধিক সংবাদ-প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী লেখা। ডিসেম্বরের পর অতিরিক্ত করের হার ও স্তর, প্রণোদনা কোন অঙ্কের ওপর হিসাব হবে, পোর্টালের নিবন্ধনের খুঁটিনাটি ও পর্দার ধাপ এখানে যাচাই করা হয়নি; কিছু সূত্রে আরও কাঠামো ও আগের বছরের ৩০ নভেম্বরের সময়সীমার উল্লেখ আছে, যা এনবিআরের আদেশের সঙ্গে মেলানো যায়নি, তাই লেখায় রাখা হয়নি। কাল্পনিক: প্রণোদনার তিনটি অঙ্ক ও ১২ লাখ টাকা আয়ের উদাহরণ। রিটার্ন জমার আগে এনবিআরের সর্বশেষ নির্দেশনা বা কর পরামর্শকের সঙ্গে মিলিয়ে নিন। হালনাগাদ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬।

সাধারণ প্রশ্ন

ই-রিটার্ন কি সবার জন্য বাধ্যতামূলক?

সাধারণ ব্যক্তিকরদাতার জন্য হ্যাঁ, কর বছর ২০২৬-২৭ থেকে। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী, সনদধারী প্রতিবন্ধী, প্রবাসী বাংলাদেশি, মৃত করদাতার প্রতিনিধি ও বিদেশি নাগরিক কাগজে দিতে পারেন।

সেপ্টেম্বর পেরিয়ে গেছে, এখন দিলে কি জরিমানা লাগবে?

প্রকাশিত ঘোষণা অনুযায়ী সেপ্টেম্বরের পর দিলে প্রণোদনা মেলে না, আর অতিরিক্ত কর লাগে ডিসেম্বরের পর দিলে। অর্থাৎ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে দিলে প্রণোদনা নেই, তবে ওই ঘোষণায় অতিরিক্ত করের কথাও নেই। নিশ্চিত হতে এনবিআরের সর্বশেষ আদেশ দেখুন।

প্রণোদনার সর্বোচ্চ অঙ্ক কত?

প্রদেয় নিট করের ৫%, সর্বোচ্চ ৳ ২৫,০০০। কর ৳ ৫,০০,০০০ পর্যন্ত হলে ৫% সীমার মধ্যে থাকে; তার বেশি হলে সীমাই প্রযোজ্য।

কর কি কর অফিসে গিয়ে দিতে হবে?

না। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী ই-ট্যাক্স পোর্টালেই ব্যাংক ট্রান্সফার, কার্ড বা বিকাশ, রকেট, নগদের মতো মোবাইল আর্থিক সেবায় কর দেওয়া যায়।

রিটার্ন জমার পর কী পাব?

সঠিক তথ্যে জমা সম্পূর্ণ হলে প্রাপ্তিস্বীকারপত্র ও আয়কর সনদ সঙ্গে সঙ্গে নামানো যায়। দুটোই সংরক্ষণ করুন।