ইংরেজি তারিখ থেকে বাংলা তারিখ বের করার নিয়ম: হাতে হিসাব

২৪ অক্টোবর ২০২৬ বাংলায় ৮ কার্তিক ১৪৩৩, শনিবার, হেমন্তকাল

ফর্মে জন্মতারিখ বাংলায় চেয়েছে, কিংবা পুরোনো দলিলের তারিখ ইংরেজিতে বদলাতে হবে, কিংবা শুধু জানতে ইচ্ছে করছে আজ বাংলায় কত তারিখ। এই কাজগুলো আমাদের প্রায়ই পড়ে, অথচ হিসাবটা অনেকেরই অস্পষ্ট। বাংলা তারিখ কনভার্টার এক সেকেন্ডে উত্তর দেয়। কিন্তু উত্তরটা কীভাবে আসে, সেটা জানা থাকলে আপনি টুল ছাড়াও মোটামুটি মেলাতে পারবেন, আর কোনো ফল অদ্ভুত লাগলে কারণটাও ধরতে পারবেন। এই লেখায় ইংরেজি থেকে বাংলায় যাওয়ার নিয়মটা ধাপে ধাপে দেখব। উল্টো পথ, অর্থাৎ বাংলা থেকে ইংরেজি, আছে আলাদা গাইডে।

প্রথমে জানতে হবে নিয়মটা কোন পঞ্জিকার

বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গের বাংলা পঞ্জিকা এক নয়। পশ্চিমবঙ্গের পঞ্জিকা সূর্যসিদ্ধান্তের হিসাবে চলে, তাই মাসের শুরু আর দিনসংখ্যা আলাদা হতে পারে। টুলটি বাংলাদেশের সংশোধিত বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী হিসাব করে। এই লেখার সব নিয়ম আর উদাহরণ সেই টুলেরই নিয়ম। তাই আপনার হাতে কোনো ভারতীয় ক্যালেন্ডার থাকলে একটি-দুটি তারিখ ভিন্ন দেখলে অবাক হবেন না।

টুলের নিয়মটা চার লাইনে বলা যায়:

  • ১ বৈশাখ সবসময় ১৪ এপ্রিল।
  • বৈশাখ থেকে আশ্বিন, প্রথম ছয় মাস ৩১ দিনের।
  • কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ ও চৈত্র ৩০ দিনের।
  • ফাল্গুন সাধারণত ২৯ দিনের, আর অধিবর্ষে ৩০ দিনের।

এইটুকু মনে রাখলেই বাকিটা শুধু যোগ-বিয়োগ।

বছর আগে ঠিক করুন

বঙ্গাব্দ বের করা সবচেয়ে সহজ ধাপ, কিন্তু এখানেই বেশি ভুল হয়। নিয়ম: ইংরেজি তারিখটি যদি ১৪ এপ্রিল বা তার পরের হয়, তাহলে ইংরেজি সাল থেকে ৫৯৩ বিয়োগ করুন। আর যদি ১৪ এপ্রিলের আগের হয় (জানুয়ারি থেকে ১৩ এপ্রিল), তাহলে ৫৯৪ বিয়োগ করুন। কারণ বাংলা বছর শুরু হয় এপ্রিলের মাঝামাঝি, আর ইংরেজি বছর জানুয়ারিতে।

উদাহরণ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ হলো ১৪ এপ্রিলের পর। ২০২৬ − ৫৯৩ = ১৪৩৩। অন্যদিকে ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৪ এপ্রিলের আগে। ২০২৬ − ৫৯৪ = ১৪৩২। দেখুন, একই ইংরেজি সালের দুটো তারিখ দুটি ভিন্ন বঙ্গাব্দে পড়ল।

মাসের ছক মুখস্থ করার দরকার নেই, বুঝে নিন

নিচের ছকে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের প্রতিটি মাস ইংরেজি কোন তারিখে শুরু হয়, কত দিনের, আর কোন ঋতুতে পড়ে, তা দেওয়া হলো। প্রথমে প্রথম ছয় মাস।

১৪৩৩ বঙ্গাব্দের প্রথম ছয় মাসের শুরুর ইংরেজি তারিখ, দিনসংখ্যা ও ঋতু
বৈশাখ থেকে আশ্বিন: সব মাস ৩১ দিনের।

এরপর বাকি ছয় মাস।

১৪৩৩ বঙ্গাব্দের কার্তিক থেকে চৈত্র, শুরুর ইংরেজি তারিখ ও দিনসংখ্যা
কার্তিক থেকে চৈত্র: ফাল্গুন ছাড়া সব মাস ৩০ দিনের।

ছকে একটা সুন্দর ছাঁচ আছে। মাসের শুরুর তারিখ মোটামুটি ১৪ থেকে ১৭ তারিখের মধ্যে ঘোরে। প্রথম ছয় মাস ৩১ দিনের বলে মাসের শুরুর তারিখ ধীরে ধীরে পিছোয় (১৪, ১৫, ১৫, ১৬, ১৬, ১৬), আর কার্তিকে এসে ১৭ হয়। তারপর ৩০ দিনের মাসগুলোতে তারিখ আবার এগোতে থাকে (১৬, ১৬, ১৫, ১৪, ১৫)। ঋতুও সহজ: প্রতি ঋতু দুই মাসের। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ গ্রীষ্ম, আষাঢ়-শ্রাবণ বর্ষা, ভাদ্র-আশ্বিন শরৎ, কার্তিক-অগ্রহায়ণ হেমন্ত, পৌষ-মাঘ শীত, ফাল্গুন-চৈত্র বসন্ত। টুলও তারিখের নিচে ঋতুর নাম লেখে, যেমন “হেমন্তকাল”।

ধাপে ধাপে হিসাব: ২৪ অক্টোবর ২০২৬

ধরুন, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ বাংলায় কত, তা বের করতে চান। পদ্ধতিটা এ রকম:

  1. বছরের শুরু ধরুন ১৪ এপ্রিল ২০২৬। ওই দিন থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত কত দিন, গুনুন। এপ্রিলের ১৪ থেকে ১ মে ১৭ দিন, মে ৩১, জুন ৩০, জুলাই ৩১, আগস্ট ৩১, সেপ্টেম্বর ৩০, তারপর অক্টোবরের ২৪ থেকে ১ তারিখ বাদ দিলে ২৩। ঠিক যোগ করলে ১৭ + ৩১ + ৩০ + ৩১ + ৩১ + ৩০ + ২৩ = ১৯৩ দিন।
  2. এই ১৯৩ থেকে মাসের দিন বাদ দিতে থাকুন। বৈশাখ থেকে আশ্বিন ছয় মাস, প্রতিটি ৩১ দিন, মোট ১৮৬। ১৯৩ − ১৮৬ = ৭।
  3. পরের মাস কার্তিক। হাতে বাকি ৭ দিন, মানে কার্তিকের ৭ দিন পার হয়ে গেছে, তাই আজ ৮ তারিখ।
২৪ অক্টোবর ২০২৬-এর বাংলা তারিখ বের করার তিন ধাপ: ১৯৩ দিন, ১৮৬ বাদ, বাকি ৭ দিন, ফল ৮ কার্তিক
দিন গুনে মাসে ভাগ করার হিসাব।

উত্তর: ৮ কার্তিক ১৪৩৩, বার শনিবার, ঋতু হেমন্ত। টুল ঠিক এটাই দেখায়। সূত্রটা মনে রাখার একটা সহজ উপায়: ১৪ এপ্রিল থেকে দিন গুনে সংখ্যাটি মাসের দিনসংখ্যা দিয়ে একটা একটা করে কাটতে থাকুন, যতক্ষণ না বাকি সংখ্যাটি পরের মাসের দিনের চেয়ে ছোট হয়। বাকি সংখ্যা যোগ ১ হলো তারিখ।

আরও কয়েকটি উদাহরণ

নিচের পাঁচটি তারিখ আমি টুলের নিজের ফাংশন চালিয়ে বের করেছি, আর কয়েকটি হাতেও মিলিয়েছি।

পাঁচটি ইংরেজি তারিখের বাংলা তারিখ ও বার
পাঁচটি তারিখ, হাতে ও টুলে মেলানো।

প্রথম উদাহরণ ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। এটি ১৪ এপ্রিলের আগে, তাই বঙ্গাব্দ ২০২৬ − ৫৯৪ = ১৪৩২। বছর শুরু হয়েছিল ১৪ এপ্রিল ২০২৫। সেখান থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত মোট ৩১৩ দিন (পুরো এক বছর ৩৬৫ দিন, আর ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৪ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত ৫২ দিন, তাই ৩৬৫ − ৫২ = ৩১৩)। প্রথম ছয় মাসে ১৮৬, তারপর কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ চার মাসে ১২০, মোট ৩০৬। ৩১৩ − ৩০৬ = ৭, তাই আজ ফাল্গুনের ৮ তারিখ। ৮ ফাল্গুন ১৪৩২, শনিবার।

আরেকটি সহজ পথও আছে, যা বেশি সহজ ও নির্ভরযোগ্য: মাসের শুরুর তারিখের ছক মনে রাখুন। ১৪৩২-এ ফাল্গুন শুরু ১৪ ফেব্রুয়ারি, তাই ২১ ফেব্রুয়ারি = ১৪ ফেব্রুয়ারি + ৭ দিন = ৮ ফাল্গুন। একইভাবে চৈত্র শুরু ১৫ মার্চ, তাই ২৬ মার্চ ২০২৬ = ১২ চৈত্র ১৪৩২, বৃহস্পতিবার। মাসের শুরুর তারিখের ছক জানা থাকলে আর ১৪ এপ্রিল থেকে দিন গুনতে হয় না, শুধু ব্যবধান যোগ করলেই চলে।

বছর বদলের দুটি দিন: ১৩ ও ১৪ এপ্রিল

সবচেয়ে বেশি ভুল হয় বছর বদলের সীমানায়। ১৩ এপ্রিল ২০২৬ হলো ৩০ চৈত্র ১৪৩২, সোমবার। আর পরের দিন, ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১ বৈশাখ ১৪৩৩, মঙ্গলবার। মাঝখানে কোনো ফাঁক নেই, কোনো দিন বাদও পড়ে না। এখানে বঙ্গাব্দও বদলে যায়, কারণ ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত ৫৯৪ আর ১৪ এপ্রিল থেকে ৫৯৩ বিয়োগ হয়। তাই কেউ যদি বলেন, ১৪৩৩ সালে জন্ম, আর জন্মতারিখ এপ্রিলের শুরুর দিকে, তাহলে ১৩ বা ১৪ তারিখ কোনটি, সেটা আলাদা করে দেখে নিন।

অন্য মাসের সীমানাতেও একই সতর্কতা। ১৪ জুন ২০২৬ হলো ৩১ জ্যৈষ্ঠ, আর ১৫ জুন ১ আষাঢ়। ১৪ জানুয়ারি ২০২৭ হলো ৩০ পৌষ ১৪৩৩, আর ১৫ জানুয়ারি ১ মাঘ। ছকে দেখলে ব্যাপারটা পরিষ্কার: মাসের প্রথম দিনটি এক দিন এদিক-ওদিক হতে পারে, তাই সীমানার কাছের তারিখে নিজে হিসাব না করে টুলে একবার মিলিয়ে নিন।

বার ও ঋতু কীভাবে আসে

টুল শুধু তারিখ নয়, বারের নামও দেখায়। বার ইংরেজি আর বাংলা পঞ্জিকায় একই, কারণ দিন তো একটাই, শুধু নামকরণ ভিন্ন। ২৪ অক্টোবর ২০২৬ শনিবার, তাই ৮ কার্তিক ১৪৩৩-ও শনিবার। বারের হিসাব মেলাতে চাইলে মনে রাখুন, সাত দিন পরপর একই বার ফিরে আসে। ১৭ অক্টোবর ২০২৬ (১ কার্তিক) ছিল শনিবার, আর ঠিক সাত দিন পরে ২৪ অক্টোবর আবার শনিবার।

ঋতুর নাম মাস থেকে আসে। এখানে একটি কথা মনে রাখা ভালো: এই ঋতুবিভাগ পঞ্জিকার নিয়ম, আবহাওয়ার বিবরণ নয়। কার্তিকে হেমন্ত লেখা থাকলেও আপনার এলাকায় সেদিন বৃষ্টি বা গরম থাকতে পারে।

টুলে কীভাবে করবেন

টুলটি খুলে “ইংরেজি তারিখ থেকে বাংলা” অংশে তারিখ বেছে নিন। পাতা খুললে আজকের তারিখ আগে থেকেই বসানো থাকে, তাই আজকের বাংলা তারিখ জানতে কিছুই করতে হয় না। তারিখ বদলালেই ফল বদলে যায়, আলাদা বোতাম চাপতে হয় না। ফলে দুটি লাইন আসে: প্রথমে তারিখ ও বঙ্গাব্দ, নিচে বার ও ঋতু। এই লেখার উদাহরণগুলো বসিয়ে মিলিয়ে নিন। যদি কোনোটি না মেলে, সম্ভবত আপনি অন্য সালের তারিখ বসিয়েছেন।

কখন টুলের ফলের ওপর পুরোপুরি ভরসা করবেন না

টুলের একটি সীমা আছে, যা সততার খাতিরে বলে রাখি। টুল সব বছরের জন্য একই নিয়ম ধরে হিসাব করে: ১ বৈশাখ সবসময় ১৪ এপ্রিল, মাসের দৈর্ঘ্য সবসময় এক। কিন্তু বাংলা পঞ্জিকা সংশোধনের আগে ও পরে ভিন্ন নিয়মে চলত। তাই পুরোনো বছরের তারিখ, যেমন দলিল বা জন্মসনদের পুরোনো তারিখ, তখনকার প্রচলিত পঞ্জিকার সঙ্গে নাও মিলতে পারে। সরকারি ছুটি বা অনুষ্ঠানের তারিখ সব সময় সরকারি ঘোষণা থেকে মিলিয়ে নেবেন। আর আইনি বা সরকারি কাগজে কোনো তারিখ বসানোর আগে মূল কাগজের তারিখটিই চূড়ান্ত ধরুন।

সংক্ষেপে

ইংরেজি তারিখ বাংলায় বদলানোর পদ্ধতি তিন ধাপে: ১৪ এপ্রিলের আগে না পরে দেখে বঙ্গাব্দ ঠিক করুন, মাসের শুরুর তারিখের ছক থেকে মাস ধরুন, আর শুরুর তারিখ থেকে ব্যবধান গুনে দিন বের করুন। উল্টো কাজটি, বাংলা তারিখ থেকে ইংরেজি, করতে হলে ফাল্গুনের ২৯ বা ৩০ দিনের প্রশ্নটি আসে, যা নিয়ে পরের গাইডে বিস্তারিত লিখেছি।