
পুরোনো সোনার গহনা বেচতে গিয়ে অনেকে দেখেন, হাতে আসা টাকা আন্দাজের চেয়ে কম। সোনার দর বাড়লেও এমন হয়, কারণ বিক্রির দর বের হয় গহনার ওজন থেকে একটি অংশ “বাদ” দিয়ে, আর কেনার সময় দেওয়া মজুরি বিক্রির দামে আলাদা করে ফেরত আসে না। এই গাইডে ৪ ভরি ২২ ক্যারেট গহনার একটি কাল্পনিক উদাহরণে দেখানো হলো হাতে কত আসে, ওজন থেকে বাদের হার আমরা কোন সূত্রে কত পেয়েছি, আর বেচার আগে কী করবেন। ওজন ভরি আর গ্রামে মেলাতে সোনার ভরি ক্যালকুলেটর ব্যবহার করুন।

হাতে কত আসে: তিন ধাপের হিসাব
জুয়েলার্স সাধারণত এভাবে দাম ঠিক করেন (খুঁটিনাটি দোকানভেদে আলাদা হতে পারে):
- সোনার ওজন ধরা: গহনার মোট ওজন থেকে পাথর, মিনা বা অন্য ধাতুর ওজন বাদ দিয়ে শুধু সোনার ওজন।
- ওজন থেকে বাদ: সেই ওজনের একটি শতাংশ কেটে নেওয়া হয়। এটি টাকার ওপর নয়, ওজনের ওপর।
- দর দিয়ে গুণ: বাকি ওজনকে ওই ক্যারেটের ভরিপ্রতি দর দিয়ে গুণ করা হয়।
সূত্র: হাতে আসা টাকা = সোনার ওজন (ভরি) × (১ − বাদের হার) × ভরিপ্রতি দর। কেনার সময়কার মজুরি এই হিসাবে আলাদা করে যোগ হয় না।
ধরুন সোনার ওজন (পাথর বাদে) ৪ ভরি, ২২ ক্যারেট, ভরিপ্রতি দর ৳ ১,৫০,০০০। এই দর কাল্পনিক; আসল দর জুয়েলার্সের ঘোষিত ক্যারেটভিত্তিক দর থেকে নিন। পুরো ওজনে দাম ৪ × ১,৫০,০০০ = ৳ ৬,০০,০০০। বাদের হার তিন রকম হলে:
| বাদের হার | বাদ যায় (ভরি) | হিসাবে থাকে (ভরি) | হাতে আসে | পুরো দামের চেয়ে কম |
|---|---|---|---|---|
| বাদ নেই (শুধু তুলনার জন্য) | ০ | ৪ | ৳ ৬,০০,০০০ | ৳ ০ |
| ১০% | ০.৪ | ৩.৬ | ৳ ৫,৪০,০০০ | ৳ ৬০,০০০ |
| ১৫% | ০.৬ | ৩.৪ | ৳ ৫,১০,০০০ | ৳ ৯০,০০০ |
| ২০% | ০.৮ | ৩.২ | ৳ ৪,৮০,০০০ | ৳ ১,২০,০০০ |
বাদের প্রতি ৫ শতাংশ বিন্দু এই উদাহরণে ৳ ৩০,০০০ ফারাক আনে। শতকরা হিসাব মেলাতে শতকরা ক্যালকুলেটর কাজে লাগবে। ভরি, আনা ও রতির সম্পর্ক ও ওজনের হিসাবের গোড়ার কথা আছে সোনার ভরি, আনা, রতি ও গ্রামের হিসাব গাইডে।
বাদের হার কত: আমরা যা পেয়েছি
বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) পুরোনো গহনা বিক্রি ও বদলে ওজন থেকে বাদের হার ঘোষণা করেছে। আমরা যেসব সংবাদ পড়েছি, সেখানে এই তিনটি তথ্য পেয়েছি:
| কবের তথ্য | সূত্র | পুরোনো গহনা বিক্রিতে বাদ | গহনা বদলে বাদ |
|---|---|---|---|
| আগস্ট ২০২২ (বাজুসের ৮ আগস্টের বিজ্ঞপ্তি) | প্রথম আলো, ৯ আগস্ট ২০২২ | ১৫% (আগে ২০%) | ৮% (আগে ১০%) |
| জানুয়ারি ২০২৪ | প্রথম আলোর একটি লেখা (হালনাগাদ ১৮ জানুয়ারি ২০২৪) | কেনা দামের ২০% কম | লেখায় বদলকেও একই ধরনের বলা আছে |
| মে ২০২৪ (বাজুসের কার্যনির্বাহী কমিটি) | প্রথম আলো ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ১৪ মে ২০২৪ | ১৫% (আগে ১৩%) | ১০% (আগে ৯%) |
তিনটি কথা মাথায় রাখুন। এক, জানুয়ারি ২০২৪-এর লেখা ওজন নয়, কেনা দামের ২০% কমের কথা বলেছে, আর মে ২০২৪-এর খবরে ওই সময়ের আগের হার ১৩% বলা আছে, যা ২০%-এর সঙ্গে মেলে না; তাই হার ও হিসাবের ভিত্তি দোকানভেদে আলাদা হতে পারে ধরে নেওয়াই নিরাপদ। দুই, আমরা বাজুসের মূল বিজ্ঞপ্তি খুলে দেখিনি, সংবাদ থেকে নিয়েছি। তিন, ২০২৬ সালের বর্তমান হার আমরা কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাইনি। এই লেখা তৈরির দিন (২৯ অক্টোবর ২০২৬) হার একই আছে কি না, আমরা নিশ্চিত নই। তাই বেচার আগে জুয়েলার্সকে জিজ্ঞেস করুন, তাঁরা এখন ওজনের কত শতাংশ বাদ দেন।
বিক্রি, না বদল
একই ৪ ভরির উদাহরণে ১৫% বাদে বেচলে হাতে ৳ ৫,১০,০০০। বদলে ১০% বাদ ধরলে নতুন গহনার জন্য ৳ ৫,৪০,০০০ মূল্যের ক্রেডিট মেলে, মানে ফারাক ৳ ৩০,০০০। তবে দুটি জিনিস মিলিয়ে নিন:
- বদলে নতুন গহনা কিনতে হয়, তাই নতুন গহনার মজুরি আর প্রযোজ্য ভ্যাট আলাদা দিতে হবে। ফলে ফারাক পুরো ৳ ৩০,০০০ থাকবে না।
- ক্রেডিট ওই দোকানেই খরচ করা যায়। নগদ টাকা দরকার হলে বদল আপনার কাজে আসবে না।
প্রথম আলোর জানুয়ারি ২০২৪-এর লেখায় আরও দুটি কথা আছে: কিছু দোকান কেনার ৩ বা ৭ দিনের মধ্যে বদলে কোনো কাটছাঁট করে না, তবে সেটি সাধারণত বদলের জন্য, বিক্রির জন্য নয়; আর যে দোকান থেকে কিনেছেন, সম্ভব হলে সেখানেই ফেরত দেওয়া ভালো।
লাভ হতে দাম কত বাড়তে হয়
বাদ আর মজুরি মিলে বিক্রিতে লাভ হওয়ার একটি বাধা তৈরি হয়। ধরুন কেনার দিনে ২২ ক্যারেটের ভরিপ্রতি দর ছিল ৳ ১,০০,০০০ (কাল্পনিক) আর মজুরি ছিল ৬%, অর্থাৎ ভরিপ্রতি ৳ ৬,০০০। ৬% বাজুস মে ২০২৪-এ ন্যূনতম মজুরি হিসেবে ঘোষণা করেছিল; আপনি আসলে কত দিয়েছেন, তা রসিদে দেখুন। তাহলে প্রতি ভরির খরচ ৳ ১,০৬,০০০ (ভ্যাট ধরা হয়নি)। বিক্রিতে ১৫% বাদ গেলে প্রতি ভরির বদলে ০.৮৫ ভরির দাম পাবেন। সমান সমান হতে হলে:
০.৮৫ × বিক্রির দিনের দর = ৳ ১,০৬,০০০, তাই দর ≥ ৳ ১,২৪,৭০৬ (১,০৬,০০০ ÷ ০.৮৫), অর্থাৎ প্রায় ২৪.৭% বাড়তে হবে।

| বিক্রির দিনের দর (ভরিপ্রতি) | দর বেড়েছে | হাতে আসে (০.৮৫ ভরির দাম) | খরচ ৳ ১,০৬,০০০ থেকে ফারাক |
|---|---|---|---|
| ৳ ১,১০,০০০ | ১০% | ৳ ৯৩,৫০০ | ৳ ১২,৫০০ লোকসান |
| ৳ ১,২০,০০০ | ২০% | ৳ ১,০২,০০০ | ৳ ৪,০০০ লোকসান |
| ৳ ১,২৪,৭০৬ | ২৪.৭% | প্রায় ৳ ১,০৬,০০০ | প্রায় ০ |
| ৳ ১,৪০,০০০ | ৪০% | ৳ ১,১৯,০০০ | ৳ ১৩,০০০ লাভ |
ভ্যাট বা ক্ষয় (গহনা বানানোর সময় নষ্ট হওয়া সোনা) আপনার কেনার খরচে ধরা থাকলে সমান সমান বিন্দু আরও ওপরে যাবে। কেনার রসিদে মজুরি, ভ্যাট ও ক্ষয় আলাদা লেখা থাকলে এই হিসাব নিজের অঙ্কে বসিয়ে দেখুন।
বেচার আগে ছয়টি কাজ
- কেনার রসিদ খুঁজে নিন। ওজন, ক্যারেট, মজুরি ও পাথরের ওজন আলাদা লেখা থাকলে দর নিয়ে দোকানের সঙ্গে কথা বলা সহজ হয়।
- পাথর, মিনা ও অন্য ধাতুর ওজন আলাদা ধরুন। প্রথম আলোর জানুয়ারি ২০২৪-এর লেখা অনুযায়ী মিনার কাজের মজুরি কেনার সময় দামে ধরা থাকলেও বিক্রির সময় ধরা হয় না।
- ক্যারেট জেনে লিখে নিন। ২২, ২১, ১৮ ক্যারেট ও সনাতন পদ্ধতির দর আলাদা। একই লেখা অনুযায়ী সনাতন সোনায় অন্য ধাতু মেশানো থাকে, সর্বোচ্চ ১০ আনা খাঁটি সোনা থাকে, তাই দর কম।
- দুই বা তিন দোকানে একই প্রশ্ন করুন: কোন ক্যারেট ধরছেন, ভরিপ্রতি দর কত, ওজনের কত শতাংশ বাদ, মজুরি বা কর কাটা হচ্ছে কি না।
- যে দোকান থেকে কিনেছেন, সেখানে আগে যান। প্রথম আলোর লেখায় এই পরামর্শই আছে; তবু অন্য দোকানের দরের সঙ্গে তুলনা করুন।
- হিসাব নিজে মিলিয়ে রসিদ নিন। রসিদে ওজন, ক্যারেট, দর, বাদের হার ও মোট টাকা থাকা চাই। বড় অঙ্কের টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে নিলে হিসাব থাকে।
বিক্রির টাকা ও জাকাত
গহনা বেচে নগদ হাতে এলে জাকাতের হিসাবে আপনার সম্পদের ধরন বদলায়। নিসাব ও হার দেখতে জাকাত ক্যালকুলেটর ব্যবহার করুন; ব্যক্তিগত প্রশ্নে আলেমের পরামর্শ নিন।
সীমাবদ্ধতা ও হালনাগাদ: এই লেখার সব দর ও টাকার অঙ্ক কাল্পনিক। বাদের হার সংবাদ থেকে নেওয়া (২০২২ ও ২০২৪-এর), বাজুসের মূল বিজ্ঞপ্তি আমরা দেখিনি, আর ২০২৬-এর বর্তমান হার নিশ্চিত নই। বাদ, মজুরি ও ভ্যাটের সঠিক অঙ্ক আপনার জুয়েলার্সের রসিদে। হালনাগাদ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬।
সোনার পাঁচটি প্রশ্ন (ওজন, ক্যারেট, মজুরি ও ভ্যাট, বিক্রি, রসিদ) একটি গহনার উদাহরণে এক সুতোয় দেখতে পড়ুন সোনার গহনা এক জায়গায়।
সাধারণ প্রশ্ন
১৫% বাদ মানে কী, টাকার ১৫% না ওজনের?
বাজুসের ঘোষণায় এটি ওজনের হার। ৪ ভরিতে ১৫% মানে ০.৬ ভরি বাদ, বাকি ৩.৪ ভরির দাম পাবেন। কোনো দোকান কেনা দামের ওপর কাটলে (যেমন জানুয়ারি ২০২৪-এর লেখায় আছে) ফল আলাদা হবে, তাই ভিত্তিটা জিজ্ঞেস করে নিন।
কেনার সময় দেওয়া মজুরি কি ফেরত পাব?
আমরা যে লেখাগুলো পড়েছি, সেখানে বিক্রির সময় মজুরি আলাদা করে ফেরত ধরার কথা নেই; বরং বলা আছে কোনো কোনো দোকান কর ও তৈরির মজুরি কেটে রাখে। এ নিয়ে নিশ্চিত করে বলার মতো সূত্র আমরা পাইনি, তাই বেচার আগে দোকানকে জিজ্ঞেস করুন কোন কোন খাত কাটা হবে।
গহনার ওজন গ্রামে লেখা, ভরিতে কত?
গ্রামকে ১১.৬৬৪ দিয়ে ভাগ করুন। যেমন ৪৬.৬৫৬ গ্রাম = ৪ ভরি। দ্রুত করতে ভরি ক্যালকুলেটর ব্যবহার করুন।
সনাতন সোনার দর কেন কম?
সনাতন সোনায় ক্যারেটের মান নির্দিষ্ট নয় এবং অন্য ধাতু বেশি মেশানো থাকে। তাই ক্যারেটভিত্তিক দরের চেয়ে এর ভরিপ্রতি দর অনেক কম হয়।
