
সোনার দোকানে একই নকশা ২২, ২১ বা ১৮ ক্যারেটে মেলে, আর ভরিপ্রতি দামও প্রতিটির আলাদা। ক্যারেট বলে গহনার ওজনের কত অংশ খাঁটি সোনা। এই গাইডে ক্যারেট থেকে বিশুদ্ধতা ও খাঁটি সোনার ওজন, ক্যারেটভেদে দামের সম্পর্ক, হলমার্ক পড়া এবং কোন ক্যারেট সাধারণত কোন গহনায় ব্যবহার হয়, সব হাতে হিসাব করে দেখানো হলো। ওজন ও আনুমানিক দাম মেলাতে সোনার ভরি ক্যালকুলেটর কাজে লাগবে; ভরি, আনা, রতির গোড়ার কথা আছে সোনার ভরি, আনা, রতি ও গ্রামের হিসাব গাইডে।

ক্যারেট মানে কী
ক্যারেট সোনার বিশুদ্ধতার একক। পুরো ওজনকে ২৪ ভাগ ধরলে তার কত ভাগ খাঁটি সোনা, সেটিই ক্যারেট। ২২ ক্যারেটে ২২ ভাগ সোনা আর বাকি ২ ভাগ তামা, রুপা, দস্তা বা নিকেলের মতো ধাতু, যাকে খাদ বলে। সূত্র দুটি:
- বিশুদ্ধতা (%) = ক্যারেট ÷ ২৪ × ১০০
- খাঁটি সোনার ওজন = মোট ওজন × ক্যারেট ÷ ২৪
১ ভরি = ১১.৬৬৪ গ্রাম ধরে চার ক্যারেটের ছক:
| ক্যারেট | বিশুদ্ধতা | হলমার্কের সংখ্যা | ১ ভরির গহনায় খাঁটি সোনা | ১ ভরিতে খাদ |
|---|---|---|---|---|
| ২৪ | ১০০% | ৯৯৯.৯ | ১১.৬৬৪ গ্রাম | প্রায় নেই |
| ২২ | ৯১.৬৭% | ৯১৬ | ১০.৬৯২ গ্রাম | ০.৯৭২ গ্রাম |
| ২১ | ৮৭.৫০% | ৮৭৫ | ১০.২০৬ গ্রাম | ১.৪৫৮ গ্রাম |
| ১৮ | ৭৫.০০% | ৭৫০ | ৮.৭৪৮ গ্রাম | ২.৯১৬ গ্রাম |
তাই একই এক ভরি ওজনে ২২ ক্যারেটের গহনায় ১৮ ক্যারেটের চেয়ে ১.৯৪৪ গ্রাম (১০.৬৯২ − ৮.৭৪৮) বেশি খাঁটি সোনা থাকে, অর্থাৎ ২২ ÷ ১৮ হিসাবে প্রায় ২২.২% বেশি। দামের ফারাকের মূল কারণ এটিই।
খাদ থাকা মানেই কি ঠকানো
না। খাঁটি সোনা খুব নরম, তাই গহনা বানাতে ও টেকাতে তাতে অন্য ধাতু মেশানো হয়। খাদ যত বেশি, বিশুদ্ধতা তত কম আর ক্যারেট তত নিচে। ঠকানো হয় তখনই, যখন গহনায় যা বলা বা লেখা হলো তার চেয়ে খাদ বেশি। তাই আসল প্রশ্ন হলো, রসিদ ও গহনার ছাপ যে ক্যারেট বলছে, গহনা কি সত্যিই তা-ই।
কোন ক্যারেট সাধারণত কোন গহনায়
| ক্যারেট | সাধারণ ব্যবহার | বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| ২২ | চুড়ি, কানের দুল, নাকফুলসহ বেশিরভাগ গহনা | খাঁটি সোনা বেশি, তুলনায় নরম |
| ২১ | আংটি, চেইন, ব্রেসলেটের মতো নিত্যদিনের গহনা, সূক্ষ্ম নকশা | ২২-এর চেয়ে শক্ত ও টেকসই |
| ১৮ | হীরা বা দামি পাথর বসানো গহনা | আরও শক্ত, পাথর মজবুত ধরে রাখে |
এই ছক যশোরের একজন স্বর্ণ ব্যবসায়ীর বক্তব্য (বিবিসি বাংলা, ফেব্রুয়ারি ২০২৬) ও আরও দুটি সংবাদ-লেখা থেকে নেওয়া প্রচলনের সারসংক্ষেপ। এটি কোনো নিয়ম নয়; কোন ক্যারেট নেবেন, তা আপনার ব্যবহার, নকশা ও বাজেটের ব্যাপার। বেশি ক্যারেট মানে বেশি সোনা কিন্তু নরম গহনা; কম ক্যারেট মানে কম সোনা, শক্ত গহনা ও কম দাম।
ক্যারেটভেদে ভরিপ্রতি দাম কেন আলাদা
বাজুস প্রতিটি ঘোষণায় ভরিপ্রতি আলাদা দাম দেয়: ২২ ক্যারেট, ২১ ক্যারেট, ১৮ ক্যারেট ও সনাতন পদ্ধতি। কারণ ভরির ওজন এক হলেও খাঁটি সোনার পরিমাণ আলাদা। মোটামুটি আন্দাজের নিয়ম:
কোনো ক্যারেটের ভরিপ্রতি দাম ≈ ২২ ক্যারেটের দাম × (সেই ক্যারেট ÷ ২২)
ধরুন ২২ ক্যারেটের ভরিপ্রতি দাম ৳ ২,০০,০০০ (কাল্পনিক, আজকের দর নয়) এবং গহনা ২ ভরির:
| ক্যারেট | ভরিপ্রতি দাম (আন্দাজ) | ২ ভরির সোনার দাম | ২ ভরিতে খাঁটি সোনা |
|---|---|---|---|
| ২২ | ৳ ২,০০,০০০ | ৳ ৪,০০,০০০ | ২১.৩৮৪ গ্রাম |
| ২১ | ৳ ১,৯০,৯০৯ | ৳ ৩,৮১,৮১৮ | ২০.৪১২ গ্রাম |
| ১৮ | ৳ ১,৬৩,৬৩৬ | ৳ ৩,২৭,২৭২ | ১৭.৪৯৬ গ্রাম |

ভরিপ্রতি দাম পূর্ণ টাকায় গোল করে বসানো হয়েছে, তাই ২ ভরির অঙ্কে ১ টাকার মতো ফারাক আসতে পারে। ১৮ ক্যারেটে সোনার দাম ৳ ৭২,৭২৮ কম, কিন্তু খাঁটি সোনাও ৩.৮৮৮ গ্রাম কম। মজার ব্যাপার, তিন সারিতেই ১ গ্রাম খাঁটি সোনার দাম প্রায় একই, ৳ ১৮,৭০৬-এর কাছাকাছি। সস্তা দামের গহনায় সোনাও কম থাকে, এই ধারণাটাই এখানে হিসাবে দেখা যায়।
এই সূত্র শুধু আন্দাজের জন্য। আমরা জুলাই ২০২৬-এর একটি বাজুস-ঘোষণার (সংবাদে প্রকাশিত) দামে ২২, ২১ ও ১৮ ক্যারেটের অনুপাত মিলিয়ে দেখেছি; সূত্রের অঙ্ক থেকে ফারাক শতকরা ০.৩-এর কম ছিল। কিন্তু কেনাবেচায় সূত্র নয়, বাজুসের ঘোষিত দামই ধরুন।
ঘোষিত দামে ভ্যাট ও মজুরি ধরা আছে কি না
এই লেখা শুধু সোনার দাম নিয়ে। গহনার মোট দামে মজুরি ও ভ্যাট আলাদা বিষয়, আর ঘোষণার ভাষায় তা কীভাবে লেখা, সেটি দেখে নেওয়া দরকার। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর একটি প্রতিবেদনে বাজুস ঘোষিত দামের সঙ্গে ৫% ভ্যাট ও ন্যূনতম ৬% মজুরি যোগ করার কথা বলেছে; জুলাই ২০২৬-এর আরেকটি প্রতিবেদনে ২২ ক্যারেটের দাম “ভ্যাটসহ” লেখা। দুই লেখা আমরা মেলাতে পারিনি, তাই কেনার দিনের ঘোষণায় ও রসিদে ভ্যাট ও মজুরির লাইন আলাদা আছে কি না দেখে নিন। ভ্যাট আলাদা করে মেলাতে ভ্যাট ক্যালকুলেটর দেখুন।
সনাতন পদ্ধতি কী
বাজুসের তালিকায় ২২, ২১ ও ১৮ ক্যারেটের পাশে “সনাতন পদ্ধতি” নামে চতুর্থ একটি দামও থাকে। এটি আন্তর্জাতিক ক্যারেট-গ্রেড নয়, আর এর সঠিক বিশুদ্ধতা বাজুসের কোনো মূল নথিতে আমরা পাইনি। জুলাই ২০২৬-এর একটি ঘোষণায় এর ভরিপ্রতি দাম ছিল ২২ ক্যারেটের প্রায় ৬৭%। তাতে বোঝা যায় খাদ অনেক বেশি; কত, তা আমরা বলতে পারছি না। সনাতন গহনা কেনার বা বেচার আগে বিশুদ্ধতা লিখিতভাবে জেনে নিন।
ক্যারেট যাচাই করবেন কীভাবে
- হলমার্ক দেখুন। গহনার গায়ে খোদাই করা সংখ্যা ক্যারেট বলে: ৯১৬ মানে ২২, ৮৭৫ মানে ২১, ৭৫০ মানে ১৮ (আন্তর্জাতিক গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য, বিবিসি বাংলার সূত্রে)।
- ছাপা ও রসিদ মেলান। গহনায় ৯১৬ আর রসিদে ২১ ক্যারেট, এমন গরমিল থাকলে কেনার আগেই প্রশ্ন করুন।
- বাধ্যতামূলক হলেও সবাই মানে না। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে আছে, বাংলাদেশে হলমার্ক করা গহনা বিক্রি বাধ্যতামূলক হলেও অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো মানছে না বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। হলমার্ক-ছাড়া গহনায় ক্যারেটের প্রমাণ শুধু রসিদের কথা, তাই লিখিত ক্যারেট ও ওজন চেয়ে নিন।
- ঘরোয়া পরীক্ষা সীমিত। সাধারণভাবে অ্যাসিড বা চুম্বকের পরীক্ষা আসল-নকল বোঝাতে পারে, ২১ আর ২২ ক্যারেটের ফারাক নয়। এই অংশ আমাদের সাধারণ জ্ঞান; ক্যারেট নিশ্চিত করতে হলমার্ক বা পরীক্ষাগারের পরীক্ষা ভরসা।
- কেডিএম সোনা এড়িয়ে চলুন। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে আছে, ক্যাডমিয়াম মেশানো এই সোনা স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে নিষিদ্ধ।
রসিদে ক্যারেট, মোট ওজন, পাথরের ওজন ও সোনার ওজন আলাদা করে লেখা আছে কি না দেখুন; পাথর থাকলে সোনার ওজন তার বাদে ধরতে হয়। জাকাতের নিসাবে ২২ বা ২১ ক্যারেটের গহনা কীভাবে ধরবেন, সেটি আলেমের কাছে জেনে নিন; জাকাতের হিসাবের গোড়ার কথা আছে জাকাত হিসাবের গাইডে।
টুলে নিজের হিসাব মেলান
- সোনার ভরি ক্যালকুলেটরে “ভরি-আনা-রতি-পয়েন্ট থেকে গ্রামে” রেখে ভরি ২ দিন। ওজন ২৩.৩২৮ গ্রাম আসবে। এর ২২ ÷ ২৪ অংশ, অর্থাৎ ২১.৩৮৪ গ্রাম, ২২ ক্যারেটের গহনায় খাঁটি সোনা।
- টুলে ক্যারেটের ঘর নেই, তাই যে ক্যারেটের গহনা, তার ভরিপ্রতি দাম বসাতে হয়। ভরিপ্রতি দাম ২,০০,০০০ দিলে (মজুরি ও ভ্যাট ০) সোনার দাম ৳ ৪,০০,০০০ আসবে।
- দাম ১,৯০,৯০৯ দিলে ৳ ৩,৮১,৮১৮ (২১ ক্যারেটের আন্দাজ), ১,৬৩,৬৩৬ দিলে ৳ ৩,২৭,২৭২ (১৮ ক্যারেটের আন্দাজ)।
- দুই দামের অনুপাত মেলাতে শতকরা ক্যালকুলেটর কাজে লাগবে: ১,৬৩,৬৩৬ হলো ২,০০,০০০-এর প্রায় ৮১.৮২%, যা ১৮ ÷ ২২-এর সমান।
সূত্র ও যাচাইয়ের অবস্থা: বিশুদ্ধতা ও ওজনের সব অঙ্ক ক্যারেট ÷ ২৪ সূত্র ও Sellshop Tools ১.৩০.০-এর ১ ভরি = ১১.৬৬৪ গ্রাম ধরে Node-এ হিসাব করে মেলানো; দামের ছক আমাদের অনুপাতের আন্দাজ, কাল্পনিক ২২ ক্যারেটের ৳ ২,০০,০০০ থেকে। হলমার্কের সংখ্যা, ব্যবহারের প্রচলন, হলমার্ক বাধ্যতামূলক হওয়ার কথা ও কেডিএম নিষেধের তথ্য বিবিসি বাংলার (ফেব্রুয়ারি ২০২৬) প্রতিবেদন থেকে, যেখানে আন্তর্জাতিক গোল্ড কাউন্সিল ও বাজুস সভাপতিকে উদ্ধৃত করা হয়েছে; মূল নথি বা আইন আমরা নিজে খুলিনি। বাজুসের ঘোষণার ধরন (চার ক্যাটাগরি, ভ্যাট ও মজুরির কথা, অনুপাত ও সনাতনের শতাংশ) ফেব্রুয়ারি ও জুলাই ২০২৬-এর কয়েকটি সংবাদ-প্রতিবেদনের অঙ্ক থেকে, বাজুসের নিজের বিজ্ঞপ্তি নয়। যাচাই-না-হওয়া: সনাতনের বিশুদ্ধতা, হলমার্ক বাধ্যতামূলক করার আইনি ভিত্তি ও এখনকার অবস্থা, বাজুসের অনলাইন যাচাই-ব্যবস্থা চালু হয়েছে কি না, ঘোষিত দামে ভ্যাট ধরা আছে কি না। এটি সাধারণ তথ্য ও আনুমানিক হিসাব, কেনাবেচার বা বিনিয়োগের পরামর্শ নয়। সর্বশেষ হালনাগাদ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬।
সোনার পাঁচটি প্রশ্ন (ওজন, ক্যারেট, মজুরি ও ভ্যাট, বিক্রি, রসিদ) একটি গহনার উদাহরণে এক সুতোয় দেখতে পড়ুন সোনার গহনা এক জায়গায়।
সাধারণ প্রশ্ন
২২ ক্যারেট সোনা কত শতাংশ খাঁটি?
২২ ÷ ২৪ × ১০০ ≈ ৯১.৬৭%। হলমার্কে এটি ৯১৬ লেখা হয়। বাকি প্রায় ৮.৩৩% তামা, রুপা বা অন্য ধাতুর খাদ।
২১ ক্যারেটের দাম ২২ ক্যারেটের চেয়ে কত কম হয়?
সরল অনুপাতে ২১ ÷ ২২, অর্থাৎ প্রায় ৪.৫৫% কম। ২২ ক্যারেটের ভরিপ্রতি দাম ৳ ২,০০,০০০ হলে ২১ ক্যারেট প্রায় ৳ ১,৯০,৯০৯, ফারাক ৳ ৯,০৯১। এটি আন্দাজ; বাজুসের ঘোষিত তালিকার দাম একটু আলাদা হতে পারে।
১৮ ক্যারেট কি সবসময় ২২ ক্যারেটের চেয়ে সস্তা?
সোনার ভরিপ্রতি দামে হ্যাঁ, কারণ সোনা কম। কিন্তু গহনার মোট দামে মজুরি, নকশা, হীরা বা পাথর যোগ হলে ১৮ ক্যারেটের গহনা ২২ ক্যারেটের সাদামাটা গহনার চেয়ে দামি হতে পারে। তাই সোনার দাম ও বাকি খরচ আলাদা করে দেখুন।
কোন ক্যারেটের সোনা কেনা ভালো?
কোনটি সবার জন্য ভালো, এমন উত্তর নেই। বেশি সোনা চাইলে ২২, বেশি টেকসই ও নিত্যব্যবহারের জন্য ২১, পাথর বসানো গহনার জন্য ১৮ সাধারণত বেছে নেওয়া হয়। বাজেট ও ব্যবহার ধরে ঠিক করুন, আর যে ক্যারেটই নিন, হলমার্ক ও রসিদ মিলিয়ে নিন।
সোনার ক্যারেট কীভাবে যাচাই করব?
গহনার গায়ে হলমার্কের সংখ্যা (৯১৬, ৮৭৫, ৭৫০) দেখুন, রসিদে একই ক্যারেট লেখা আছে কি না মিলিয়ে নিন। হলমার্ক না থাকলে লিখিত ক্যারেট ও ওজন চেয়ে নিন এবং পরীক্ষাগারে বা মেশিনে যাচাইয়ের সুযোগ আছে কি না জিজ্ঞেস করুন।
